মৃত্যু সবকিছুকে জয় করতে পারে না! তার আধিপত্য কেবল জড়সমষ্টির ওপর। মানুষের চিন্তায় যে ঈশ্বর-অগ্নি, তাকেও নেভাতে পারে না মৃত্যু
একজন ভারতবাসী। এবং তাঁর পক্ষে যে বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব সম্ভব তা তিনি প্রমাণ করেছিলেন। এর জন্য পেতে হয়েছে দুঃখ,কষ্ট আর যন্ত্রণা। পেরোতে হয়েছে বহু পথ। নৈরাশ্য তাঁকে পারেনি আঁকড়ে থাকতে। বিজ্ঞান সবার জন্য—একথা তিনি জোরের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন। মৃত্যু সবকিছুকে জয় করতে পারে না। তার আধিপত্য কেবল জড়সমষ্টির ওপর। মানুষের চিন্তায় যে ঈশ্বর-অগ্নি, তাকেও নেভাতে পারে না মৃত্যু। চিন্তায় থাকে অমরত্ব, টাকাপয়সায় নয়। বিজ্ঞানের নানা শাখায় ছিল তাঁর গবেষণা। ফরিদপুরে কাটে ছোটবেলা।পাঁচ বছর বয়সে পাঠশালার পাঠ চুকিয়ে চলে এলেন কলকাতায়। তখন নয়। ভরতি হলেন হেয়ার স্কুলে। এখানে তিন মাস পড়ার পর সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। হস্টেলে কাটে দিন। ষোলো বছরে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করলেন। তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এই কলেজে পড়াতেন ফাদার লাফোঁ। পদার্থবিদ্যার প্রতি বাড়ল টান। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি।
লন্ডনে ডাক্তারি পড়া শুরু করলেন। হল কী, ঘটল এক মজার ঘটনা। কিছুদিন ডাক্তারি পড়া চলাকালে মড়াকাটার দিন এল। তারপর তো প্রবল জ্বর। অবশেষে সব ছেড়েছুড়ে ভরতি হলেন কেমব্রিজে, বিজ্ঞান শাখায়। এখানে পড়ার সময় অধ্যাপক লর্ড রালি ও ভাইনমের সঙ্গে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেই সময় আরও কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। চার বছর কাটল বিদেশে। তারপর কেমব্রিজের ট্রাইপস এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসপি পাশ করে ফিরে এলেন দেশে।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ। পদার্থবিদ্যায় অস্থায়ী অধ্যাপনার চাকরি নিলেন জুটিয়ে।তখন পঁচিশ। এদিকে মন পড়ে থাকল গবেষণায়। উপায় কী। প্রেসিডন্সিতে তেমন কোনও যন্ত্রপাতি নেই যে ইচ্ছা্মতো পরীক্ষানিরীক্ষা করা যায়। তাতে কিন্তু তিনি দমলেন না। ছেড়ে দেবার পাত্র তিনি নন। এখানেই চলল নিরন্তর সাধনা। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে আলোচনার ব্যবস্থা করা হল।পাঠ করলেন তাঁর মৌলিক গবেষণা। বিষয় ছিল বিদ্যুৎরশ্মির দিক পরিবর্তন। ঠিক এমন সময় আবিষ্কৃত হয়েছিল নিয়োলাইট, সার্পেনটাইন প্রভৃতি পাথরের বৈদ্যুতিক কম্পন পরিবর্তন করার শক্তি। যাইহোক, কিছু সময় কাটল। প্রকাশ পেল দুটি দীর্ঘ বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ। তাও আবার লন্ডনের দি ইলেকট্রিশিয়ানের মতো পত্রিকায়। ঠিক এই বছর বিদেশের রয়াল সোসাইটি তাঁর গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। এবং দায়িত্ব নেয়। সঙ্গে আর্থিক বিষয়ে সাহায্যের ব্যবস্থাও করা হয়। এসবের গুরুত্ব বুঝে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি উপাধি দিয়ে সম্মান জানায়।
ভারত সরকারের সাহায্য পেলেন। গবেষণায় ফল প্রচারের জন্য গেলেন বিদেশে। ইয়োরোপের বহু বিজ্ঞানীদের সঙ্গে করলেন আলাপ-আলোচনা। সঙ্গে গেলেন স্ত্রী।ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের অধিবেশন বসল লিভারপুলে। ওই অধিবেশনে জগদীশচন্দ্র দেখালেন, তাঁর বিদ্যুৎরশ্মি গবেষণার যন্ত্রপাতি। প্রকাশ পেল সেখানকার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন তাঁর কাজের ভীষণ প্রশংসা করলেন। তারপর আমন্ত্রিত হলেন লন্ডনের রয়াল ইন্সটিটিউশনে। বক্তৃতা দিলেন। তারপর ফ্রান্স-জার্মানিতে ক্রমে তাঁর প্রতিভার কথা, বিজ্ঞান-বিষয়ে গবেষণার কথা ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে।
তারপর ফিরলেন নিজের দেশে। বিশ্রাম বলে তাঁর জীবনে কোনও কিছু ছিল না। ফিরেই অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে চলল গবেষণার কাজ। তিন বছর পর আবার বিদেশে গেলেন। প্যারিসে বসল বিজ্ঞানীদের একটি মহাসভা। সেখানে গেলেন তিনি। তারপর আবার লন্ডনে। তারপর ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের ব্রাডফোর্ড সভায় প্রবন্ধ পাঠ। সেখানে সবাই স্বীকার করে নিলেন তাঁর সত্যতা। পদার্থবিদ্যার বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে নিলেও শারীরবৃত্তবিদগণ রইলেন নীরব। তিনি প্রমাণ করলেন, তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্র জড় ও জীবন যে সাড়া দিতে পারে তার সাড়ালিপি এঁকে। বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড় ও জীবন একই প্রকার সাড়া দিতে পারে। এর কারণ, পদার্থের আণবিক বিকৃতি।
আবার বিদেশ যাত্রা। জীব ও উদ্ভিদের স্নায়ুর সাড়া সম্পর্কীয় তিনি সাতটি প্রবন্ধ লিখলেন। এবং তা পাঠালেন রয়াল সোসাইটিতে। ঠিক তিন বছর চালালেন নানা পরীক্ষানিরীক্ষা। লিখে ফেললেন সেসব বিষয়ে দুখানি বই। লিখলেন উদ্ভিদের সাড়া এবং তুলনামূলক বৈদ্যুতিক শারীরবৃত্ত। কিন্তু তার আগে জীব ও জড়ের সাড়া নিয়ে লিখেছিলেন একটি বই। সে বই সাড়া ফেলেছিল ইয়োরোপের বিজ্ঞানীমহলে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা ঘুরে দেখালেন তাঁর পরীক্ষাগুলো।সাড়া ফেলল নতুন করে বিজ্ঞানীমহলে। আবার বিদেশে গিয়ে লাভ করলেন চরম স্বীকৃতি।
ফিরলেন নিজের দেশে। গড়ে তুললেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। শেষবার বিদেশ ভ্রমণে ইয়োরোপের বিজ্ঞানীরা জানালেন সম্মান। দিলেন অভ্যর্থনা। জানালেন শ্রদ্ধা।


