বিপিন পাল স্মৃতি ভবনে বর্ণাঢ্য আয়োজন, বাঙালি ও বাংলা ভাষার ওপর আগ্রাসন রুখতে সংহতির ডাক
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শ্রীভূমি : বরাক উপত্যকার সীমান্ত শহর শ্রীভূমির (করিমগঞ্জ) অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘চারণিক’-এর ৪৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় ও সাড়ম্বরে পালিত হলো। শনিবার স্থানীয় বিপিন পাল স্মৃতি ভবনে (বঙ্গভবন) আয়োজিত এই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন সংগঠনের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস উঠে এসেছে, তেমনি কিংবদন্তি সুরকার সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ ও ভাষা শহীদদের প্রতি জানানো হয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন সংগঠনের সভাপতি সুহাস রঞ্জন দাস। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নিখিল রঞ্জন দাস, অসিত ভূষণ দেব, দুর্বাদল দাস, রাজশেখর মিত্র মজুমদার, সুবীর বরণ রায়, শরদিন্দু দাস, বিধায়ক ভট্টাচার্য, অপর্ণা দেব, মনোজিৎ চৌধুরী সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

উদ্বোধনী পর্বে চারণিকের শিল্পীরা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা’—এই কালজয়ী গান দুটির সমবেত পরিবেশনার মাধ্যমে এক আবেগঘন আবহ সৃষ্টি করেন।
সংগঠনের সভাপতি সুহাস রঞ্জন দাস তাঁর স্বাগত ভাষণে চারণিকের ৪৬ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলার স্মৃতিচারণ করেন। অনুষ্ঠানের মুখ্য বক্তা, বিশিষ্ট চিকিৎসক তথা সাহিত্যিক ড. মৃন্ময় দেব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার ওপর ক্রমবর্ধমান ‘সরকারি আগ্রাসনের’ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং উত্তরণের সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। সাংস্কৃতিক পর্বের বিশেষ আকর্ষণ ছিল কিংবদন্তি সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ পালন। চারণিক পরিচালিত ‘গীতবীথি সংগীত মহাবিদ্যালয়’-এর ছাত্রীরা সলিল চৌধুরীর কালজয়ী সৃষ্টি ‘ধীতাং ধীতাং বোলে’ ও ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’ গান দুটির সঙ্গে চমৎকার নৃত্য পরিবেশন করেন।
পুষ্পাঞ্জলি দাস ও বর্ষা দাসের নির্দেশনায় এই পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া রূপশ্রী দাসের পরিচালনায় শুভব্রতা দাসের একক নৃত্য পরিবেশনা ভাষা শহীদদের প্রতি অনন্য শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে ওঠে।

সংগীতের আসরে শিশুশিল্পী অনন্যা চক্রবর্তী ‘না যেও না রজনী এখনো বাকি’ (বাংলা ও হিন্দি) এবং ‘ও বাঁশি কেন গায়’ গেয়ে শ্রোতাদের আপ্লুত করে। শিল্পী সৌরভ চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি’ এবং ‘বাজে গো বীণা’ গান দুটি প্রশংসিত হয়। বর্তমানে শিলচরের বাসিন্দা এবং সংগঠনের আজীবন সদস্য বিধায়ক ভট্টাচার্য বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় বাংলা ও হিন্দি গানের মাধ্যমে সলিল চৌধুরীকে স্মরণ করেন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে চারণিক পরিবারের সদস্যরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন সলিল চৌধুরীর বিখ্যাত তিন গান— ‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে’ এবং ‘পথে এবার নামো সাথী’। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন মল্লিকা দাস চৌধুরী ও মনোজিৎ চৌধুরী।
যন্ত্র সংগীতে সহযোগিতা করেন রঞ্জিত দেব ভানু (সিন্থেসাইজার), রাজেশ নাথ (তবলা), পার্থ কর্মকার (গিটার) ও শিবু মজুমদার (প্যাড)। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত নিপুণভাবে সঞ্চালনা করেন সুদীপ্তা দে চৌধুরী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষে গত ১ জানুয়ারি আয়োজিত ৪৩তম ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। সংগঠনের সম্পাদকের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।


