মানুষের চাহিদা যদি স্বচ্ছ ও কলুষমুক্ত হয়, তবে তা পূরণে ঈশ্বর সর্বদা সহায় হন: অধ্যাপক মদন মোহন গোয়েল
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শিলচর। শনিবার শিলচর প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হল ‘নিডোনমিক্স’ বিষয়ক এক বিশেষ আলোচনা সভা। ‘শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে কেআরসি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘উত্তর-পূর্ব সংহতি র্যালি ২০২৬’ এবং ‘কেআরসি বরাক উৎসব’-এর অঙ্গ হিসেবে এই জীবনমুখী আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, তিনবারের প্রাক্তন উপাচার্য তথা নিডোনমিক্স স্কুল অব থট-এর প্রবক্তা অধ্যাপক মদন মোহন গোয়েল।

অধ্যাপক গোয়েল তাঁর বক্তব্যের শুরুতে বিশ্বাসের শক্তির ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই তাঁর জীবনের পাথেয়। জনৈক সন্ন্যাসীর সান্নিধ্যে আসার পর তাঁর চিন্তাধারায় যে পরিবর্তন আসে, তার উল্লেখ করে তিনি জানান, মানুষের কেবল প্রকৃত ও প্রয়োজনীয় চাহিদা থাকা উচিত। মানুষের চাহিদা যদি স্বচ্ছ ও কলুষমুক্ত হয়, তবে তা পূরণে ঈশ্বর সর্বদা সহায় হন।
নিডোনমিক্সের মূল ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি চারটি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা। অধ্যাপক গোয়েল কঠোর শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রতিদিন ‘ব্রহ্ম মুহূর্তে’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগে শয্যা ত্যাগ করা এবং দিনের ২৪ ঘণ্টার সঠিক ব্যবহারই সফলতার চাবিকাঠি। তাঁর মতে—সময়, শক্তি কিংবা সম্পদ, কোনও কিছুরই অপচয় করা উচিত নয়।

সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের চারপাশে মূলত চার ধরনের মানুষ দেখা যায়—অসতর্ক, অবহেলিত, অকেজো এবং অব্যবহৃত। নিডোনমিক্সের লক্ষ্য হল এই স্তরের মানুষকে সচেতন ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
বিকশিত ভারতের স্বপ্ন সফল করতে স্কিল ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও মেক ইন ইন্ডিয়ার মতো প্রকল্পগুলোর সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিপণনের ক্ষেত্রে লোভকে বিসর্জন দিয়ে সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই প্রকৃত উদ্যোক্তার কাজ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে অধ্যাপক গোয়েল বলেন, মানব শরীরকে মন্দিরের মতো পবিত্র রাখা উচিত। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষার সংমিশ্রণ বা ব্লেন্ডেড মোড-এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্জিত আচরণের প্রয়োজন রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার সম্পর্কেও সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্থা কেআরসি ফাউন্ডেশনের ম্যানেজিং ট্রাস্টি তথা সিইও বিশ্বদীপ গুপ্ত র্যালির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জানান, গত ৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মাসব্যাপী র্যালি আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংহতি রক্ষা করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। অধ্যাপক গোয়েল এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে নিডোনমিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ অধ্যাপক পার্থঙ্কর চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বর্তমানের ভোগবাদী মানসিকতার সমালোচনা করেন। তিনি উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেন। সমাজকর্মী সঞ্জিত দেবনাথ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আদর্শ অনুসরণ করে চরিত্র গঠনের মাধ্যমে সমাজসেবায় ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে শিলচর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপর আলোকপাত করেন।
আলোচনা সভার শেষে অধ্যাপক মদন মোহন গোয়েলকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। বিশ্বাস, সময় এবং অর্থনীতির এক অনন্য সমন্বয়ের বার্তা নিয়ে এই জ্ঞানগর্ভ সন্ধ্যার সমাপ্তি হয়।

Promotional | North East Integration Rally



