পুনর্বাসনের পরেই হামলা, বনধের ডাক, বাড়লো তদন্ত কমিশনের মেয়াদ
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
মণিপুর: অভ্যন্তরীন বাস্তুচ্যুতদের (IDP) পুনর্বাসনের কয়েক ঘণ্টা পরই ফের উত্তাল হয়ে উঠল মণিপুর। মঙ্গলবার গভীর রাতে বিষ্ণুপুর জেলার মৈতেই অধ্যুষিত ফৌগাকচাও ইখাই এবং তোরবাং গ্রামে কুকি-অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর জেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা হামলা চালায়। এই নতুন সহিংসতা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতা মেটানোর প্রচেষ্টাকে ধাক্কা দিয়েছে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, কুকি-অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর জেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র হামলাকারীরা স্থানীয়ভাবে তৈরি পম্পি (বোম লঞ্চার) ব্যবহার করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে এবং বোমা নিক্ষেপ করে। এই আক্রমণের লক্ষ্য ছিল বিষ্ণুপুরের মৈতেই অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী গ্রাম ফৌগাকচাও ইখাই ও তোরবাং।

এই হামলার সময়কাল ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। চূড়াচাঁদপুরে পুলিশের মহাপরিচালক (DGP) একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠক শেষ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই গোলাগুলি শুরু হয়। এর ঠিক একদিন আগেই ৯৭টি পরিবারের ৩৮৯ জন মৈতেই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে সরকারিভাবে প্রভাবিত গ্রামগুলিতে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল।
হামলার খবর পেয়ে নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পাল্টা জবাব দেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি চলে। পরবর্তীতে আরও অতিরিক্ত বাহিনী পৌঁছলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। যদিও এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে বেশ কিছু সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে এবং সদ্য পুনর্বাসিত পরিবারগুলির মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তী চিরুনি অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ দল পার্শ্ববর্তী কুকি-অধ্যুষিত এলাকার কৃষি জমি থেকে তিনটি পম্পি লঞ্চার উদ্ধার করেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র বিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। মৈতেই বাসিন্দা এবং নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলি অভিযোগ করেছে যে, এটি কুকি জঙ্গিদের একটি সুপরিকল্পিত হামলা, যার উদ্দেশ্য পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত করা এবং নতুন করে মৈতেই দের বাস্তুচ্যুত করা। অন্যদিকে, কুকি-জো কাউন্সিল পুনর্বাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, তোরবাং এলাকা একটি বাফার জোন এবং বড়দিনের মরসুমে সেখানে মৈতেই দের পুনর্বাসন দেওয়া একটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ।
উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল নারী কর্মী মণিপুর জুড়ে অনির্দিষ্টকালের বনধের ডাক দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, মৈতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি আনুষ্ঠানিক ও পারস্পরিক স্বীকৃত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
একই সময়ে, সমরৌ নাওরেন আপুনবা মীরা পাইবি এবং সমরৌ আইডিপি-র সদস্যরা কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সংগঠনের সচিব ওইনাম চাওবা চানু অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্র “ভাগ করো ও শাসন করো” নীতি অনুসরণ করছে এবং বারবার হওয়া হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত তিন বছর ধরে ত্রাণ শিবিরে বসবাসকারী হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য একটি সুসংহত পুনর্বাসন পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
এই নতুন অস্থিরতার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মণিপুরের জাতিগত সহিংসতা তদন্তে গঠিত কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কমিশনের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গুয়াহাটি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অজয় লাম্বার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশনের মেয়াদ এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো বাড়ানো হলো। এই কমিশন ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া সহিংসতার কারণ, বিস্তার এবং প্রশাসনিক ত্রুটিগুলি খতিয়ে দেখছে।
এই মেয়াদ বৃদ্ধি এমন এক সময়ে হলো, যখন সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৈতেই ও কুকি বিজেপি বিধায়কদের দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লিতে পৃথক বৈঠক, এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও সাসপেনশন অফ অপারেশনস (এসওও) চুক্তির অধীনে থাকা কুকি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা।
বিষ্ণুপুর জেলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে এই হামলা নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি, বাফার জোনগুলিতে সুরক্ষা এবং চলমান শান্তি উদ্যোগগুলির কার্যকারিতা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছে। যে পরিবারগুলি সবেমাত্র তাদের ঘরে ফিরেছিল, তাদের মনে আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয় দানা বেঁধেছে। এই ঘটনা মণিপুরের মাটিতে রাজনৈতিক আলোচনা এবং অস্থির বাস্তবতার মধ্যেকার নাজুক ব্যবধানকে আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।



