লামডিংবাসীর প্ৰতিবাদে গোয়ালপাড়ার নরঘাতক বুনো হাতি ‘লাদেন’কে রাজ্য চিড়িয়াখানায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত বন দফতরের

3 - মিনিট |

লামডিঙের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতি করিডোরের গভীর জঙ্গলে স্থানান্তরিত করতে তৎপরতা শুরু করেছিল দফতর

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

শোণিতপুর জেলার অন্তর্গত সতিয়ার বিজেপি বিধায়ক পদ্ম হাজরিকার নেতৃত্বধীন অভিযানকারী দলের হাতে গোয়ালপাড়া জেলার রংজুলি এলাকার নরঘাতক ‘লাদেন’ নামে প্রকাণ্ড বুনো হাতিকে ট্র্যাংকুলাইজড করা হয়েছে গতকাল। এবার তাকে কোথায় ছাড়া হবে তা নিয়ে বিপাকে পড়েছে রাজ্যের বন দফতর।

প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ট্র্যাংকুলাইজড নরঘাতক দলছুট বুনোহাতি ‘লাদেন’ (ভুক্তভোগীদের কর্তৃক প্রদত্ত প্রচলিত নাম)-কে মধ্য অসমের হোজাই জেলার লামডিং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীর জঙ্গলে ছাড়া হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তুতিও চালিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিক-কর্মচারীরা। কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এই খবর সম্প্রচারিত হলে বেঁকে বসেন লাংমডিঙের মানুষ। বন দফতরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোমবার সন্ধ্যায় লামডিং এবং হোজাইয়ের জনসাধারণ গর্জে ওঠেন। এতে ‘লাদেন’কে নিয়ে বিপাকে পড়ে বন দফতর।

জানা গেছে, গতকাল ঘুম পাড়ানি গুলিতে বিদ্ধ হয়ে নিয়ন্ত্রিত বুনো হাতিকে আজ মঙ্গলবার লামডিঙের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতি করিডোরের গভীর জঙ্গলে স্থানান্তরিত করতে তৎপরতা শুরু করেছিল দফতর। এই খবর পেয়ে লামডিঙের মানুষ তাঁদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে তীব্র প্রতিবাদ সংগঠিত করেন। এর পর গতকাল গোটা রাত এবং আজ সকাল পর্যন্ত ঘন ঘন বৈঠকে ‘লাদেন’-এর ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু করে রাজ্যের বন দফতর। 

বন দফতর সূত্রের সর্বশেষ খবর, ‘লাদেন’কে গুয়াহাটিতে অসম রাজ্য চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। এখানে চিড়িয়াখানায় তার চিকিৎসাও করা হবে। তবে এই খবর লেখা পর্যন্ত এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে সূত্রটি। আজ সন্ধ্যার মধ্যে ‘লাদেন’কে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এদিকে বিধায়ক পদ্ম হাজরিকাও এখনও রংজুলিতে অবস্থান করছেন। ‘লাদেন’-এর ভবিষ্যত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর বিধায়ক রংজুলি ছাড়বেন, জানিয়েছে সূত্রটি।

এদিকে গোয়ালপাড়া জেলায় সন্ত্রাসরাজ কায়েম সৃষ্টিকারী বুনো হাতি লাদেনকে নিয়ন্ত্রিত করায় বিধায়ক পদ্ম হাজরিকাকে তাঁর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। এক বিবৃতিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে যথার্থ কীর্তির নিদর্শন রেখেছেন পদ্ম হাজরিকা। ঘটনাস্থল থেকে বহু দূর শোণিতপুর জেলার সতিয়ার বিধায়ক গোয়ালপাড়ায় গিয়ে সেখানকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে যে অবদান রেখেছেন তা রাজ্যবাসী চিরকাল মনে রাখবেন।

প্রসঙ্গত, বুনো হাতি লাদেনের হামলায় গত ২৯ অক্টোবর ভোর থেকে মাত্র ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে এক বালক ও তিন মহিলা-সহ মোট পাঁচ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া গত দুবছরে পঞ্চাশের বেশি মানুষ তার হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন। লাদেন নামের হাতিটির আক্রমণে নিহত পাঁচজনের নিকট আত্মীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এককালীন চার লক্ষ টাকা করে সরকারি সাহায্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নরঘাতক লাদেনকে যে কোনও উপায়ে শীঘ্র ট্র্যাংকুলাইজড করতে বন দফতরকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল।

খবর পেয়ে বুনো হাতিদের কাবু করতে পৈত্রিক সূত্রে অভিজ্ঞ সতিয়ার বিধায়ক পদ্ম হাজরিকা ও তাঁর দাদা মৃদুল হাজরিকা (বাবা দা) মুখ্যমন্ত্রীর আগ্রহে ‘লাদেন’কে ধরতে ময়দানে নামেন। তাঁর নিজের শিকারি ‘রামু’ এবং অন্য ‘লক্ষ্মী’ ‘সরস্বতী’দের নিয়ে ‘লাদেন’ পাকড়াও অভিযান চালাতে গত শুক্রবার গোয়ালপাড়ার রংজুলিতে যান বিধায়ক পদ্ম। সেখানে গিয়ে প্ৰথমে ধূপধরায় বন দফতরের রেস্ট হাউসে বিভাগীয় পদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর বিধায়ক হাজরিকা ‘লাদেন’-এর সন্ধানে তথ্য সংগ্ৰহ করতে কন্যাকুচি বনাঞ্চলে গিয়ে হাজির হন। ইতিমধ্যে ‘লাদেন’-এর অবস্থান জানতে ড্রোনের সাহায্য নেওয়া হয়। অত্যন্ত চতুর ‘লাদেন’ ঘন ঘন স্থান বদল করায় তার নির্দিষ্ট অবস্থান জানতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিল বিধায়কের নেতৃত্বাধীন অভিযানকারী দলের। 

অবশেষে সোমবার সকালে রংজুলি এলাকার চটাবাড়ি জঙ্গলে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে গণেশ পূজার আয়োজন করে পিঠে দু-নলি বন্দুক ও খাদ্য সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে ‘রামু’র পিঠে চড়ে অন্য ছয়টি শিকারি হাতি ও অভিযানকারী সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করেন পদ্ম হাজরিকা। এর পর মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে খবর আসে ‘লাদেন’কে ঘুম পাড়ানির গুলি ছুঁড়ে বশ করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন শিকারি-বিধায়ক পদ্ম হাজরিকা।

তাঁর অভিযান সম্পর্কে বিধায়ক পদ্ম বলেন, তাঁর ইনফরমেশন সঠিক থাকায় লাদেনকে বশে আনতে সময় লাগেনি। একেবারে নির্দিষ্ট স্থানে তাঁরা গিয়ে পৌঁছলে শূঁড় উঁচিয়ে ‘রামু’র দিকে তেড়ে আসে দুর্ধর্ষ প্রকাণ্ড বুনো হাতি লাদেন। অগত্যা তিনি তাকে লক্ষ্য করে ঘুম পাড়ানির গুলি ছুঁড়েন। সঙ্গে সঙ্গে অন্য অভিযানকারী এক সদস্যও অনুরূপ গুলি ছুঁড়ে তাকে কাবু করেন। পর পর দুটি গুলিতে বিদ্ধ হয়ে থমকে যায় লাদেন। ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সে। তিনি জানান, মনে হয়েছে লাদেন কিছুটা অসুস্থ। তাকে সুস্থ করে তোলাই হবে প্রধান কাজ। এই অভিযানে সহায়ককারী বন ও পশু দফতর এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিধায়ক পদ্ম হাজরিকা। বলেছেন, এখন থেকে এলাকার মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমতো পারবেন। প্রসঙ্গত, বিধায়ক পদ্ম হাজরিকা এবং তাঁর বাপ-দাদারা নাকি এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০টি বুনো হাতিকে ট্র্যাংকুলাইজড করে বশে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর প্রশিক্ষিত ‘রামু’ (পোষা হাতি)-র সাহায্যে ‘লাদেন’কে পাকড়াও করা কোনও বিশেষ অসুবিধা হবে না জেনেই অভিযানে নেমেছিলেন তিনি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related news