শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড

4 - মিনিট |

চৌধুরী মামুনের ৫ বছর কারাদণ্ড

সমীরণ রায়

ঢাকা : জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালেরও একই সাজা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে দেওয়া হয়েছে ৫ বছরের সাজার লঘুদণ্ড। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার বাংলাদেশের বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণা করে। ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে মোট ছয়টি অংশ ছিল।

ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং প্রথম সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ রায়ের দুটি অংশ পড়ে শোনান। সবশেষে আসামিদের সাজার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। এদিকে, রায়ের জন্য  সকালে মামুনকে আদালতে হাজির করা হয়।

রায় শেষে তাকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে। সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন সরকারের পদত্যাগের এক দফার রূপ নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে; হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর তার বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা হয় দেশের বিভিন্ন আদালত ও থানায়।

আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে সেসব মামলায় আসামি করা হয়। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এ মামলার রায় ঘোষণার কার্যক্রম আদালত থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এ রায়ের প্রভাব যে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কোন অপরাধে কী সাজা: জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছিল এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে প্রথম অভিযোগে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড।

দ্বিতীয় অভিযোগে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’, চতুর্থ অভিযোগে চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনাতেও শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। এই তিন অভিযোগ মিলিয়ে তাকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।

চতুর্থ অভিযোগে চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল।

তাদের মধ্যে কামালকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। আর মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে তথ্য দিয়ে অপরাধ প্রমাণে সহযোগিতা করায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার আসামিদের সাজা ঘোষণা করে বলেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২০ (৩) ধারা অনুযায়ী, প্রচলিত রেওয়াজ মাফিক কার্যকর করা হবে।

বাংলাদেশের রেওয়াজ অনুযায়ী, বেসামরিক আদালতের রায়ে আসামিকে আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করারও সুযোগ পাবেন। তবে শেখ হাসিনা ও কামাল পলাতক থাকায় আপিল করতে চাইলে তাদের ট্রাইব্যুনাল আত্মসমর্পণ করে এক মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে।

কার কী প্রতিক্রিয়া: ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা মনে করি এই রায়টি কনো ধরনের কোনো অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি হচ্ছে জাতির প্রতিজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। এটা হচ্ছে জাতির কোয়েস্ট ফর জাস্টিস।

এই রায় প্রমাণ করেছে- অপরাধী যত বড় হোক, যত ক্ষমতাশালী হোক সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এবং বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে যত বড় অপরাধীই হোক, তার অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে এবং তার প্রাপ্য শাস্তি পেতে হবে।

‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’ মেনে এ বিচারের রায় হয়েছে দাবি করে তাজুল বলেন, “আমরা এটাও একই সাথে বলতে চাই, যে কোয়ালিটি অফ এভিডেন্স এখানে দেখানো হয়েছে, যে ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ এই আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, বিশ্বের যে কোনো আদালতের স্ট্যান্ডার্ডে এই সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। এবং পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজকে যেসব আসামিকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই সেই শাস্তি পাবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা মনে করি, শহীদদের প্রতি, দেশের প্রতি, এদেশের মানুষের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা পরিশোধের স্বার্থে এ রায় একটি যুগান্তকারী রায়। এ রায় প্রশান্তি আনবে, ভবিষ্যতের প্রতি একটা বার্তা, বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের প্রতি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

রায় বাস্তবায়ন কীভাবে হবে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, রায় বাস্তবায়ন আইনি পথেই, আইনসঙ্গতভাবেই হবে। বেআইনি বা আইনসঙ্গত নয়–এমন পথ সরকার অবলম্বন করবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, আমরা শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের জন্য ভারতের কাছে আবার চিঠি লিখব। ভারত যদি এই গণহত্যাকারীকে আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে একটা শত্রুতা এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ। আমরা যতদিন আছি এই বিচারকাজ চলবে। আশা করি আগামীতে যেই সরকারই নির্বাচিত হবে এই বিচারের গুরুদায়িত্ব থেকে কোনো অবস্থাতেই যেন পিছপা না হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related news