বরাক উৎসব ও এনইআইআর ২০২৬
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শ্রীভূমি :বর্তমান সময়ে যখন চারদিকে অসহিষ্ণুতা আর বিভেদের চোরাস্রোত বইছে, তখন শ্রীভূমির আকাশ-বাতাস মুখরিত হলো এক ভিন্ন সুরে। বরাক উৎসব এবং ‘এনইআইআর ২০২৬’-এর বর্ণাঢ্য আয়োজনে সীমান্ত শহর শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) হয়ে উঠল সংস্কৃতি ও সংহতির এক অনন্য পীঠস্থান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গান, নাচ আর প্রাণের স্পন্দনে মেতে উঠল আপামর জনতা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের এই মহামিলন প্রমাণ করল যে, সংস্কৃতিই পারে মানুষের হৃদয়ে সেতুবন্ধন তৈরি করতে।

উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রাক্তন সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলন করে তিনি তাঁর ভাষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিল্প ও সংস্কৃতিই হলো সেই শক্তিশালী মাধ্যম, যা মানুষের মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সপ্তভগিনী’ রাজ্যগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন অতুলনীয়, তেমনই সমৃদ্ধ এখানকার জনজাতিগত বৈচিত্র্য, ভাষা ও ঐতিহ্য। বরাক উৎসব সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করে উত্তর-পূর্বের জনপদগুলোর মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করছে। কেআরসি ফাউন্ডেশনের এই মহতী উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনে এই উৎসব আরও বৃহত্তর কলেবরে আয়োজিত হবে।

মঞ্চে একের পর এক পরিবেশনায় মূর্ত হয়ে ওঠে বাংলার মাটির ঘ্রাণ আর উত্তর-পূর্বের বৈচিত্র্য। লোকসংগীতের সুর বাতাসে ছড়িয়ে দেয় লোকজ ঐতিহ্যের সুধা, আর বাউল গানে মিশে যায় আধ্যাত্মিক আর্তি। একক সংগীতে নিয়মিত শিল্পীদের পাশাপাশি ভিন্নভাবে সক্ষম শিল্পীদের অংশগ্রহণ ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তাঁদের সুর ও ছন্দে প্রমাণিত হলো যে, শিল্পচর্চায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনও বাধা হতে পারে না। সমবেত কণ্ঠে সাংস্কৃতিক দলগুলোর পরিবেশনা ঐক্যের এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেয় উপস্থিত দর্শকদের হৃদয়ে।

নৃত্যের ছন্দেও ছিল বৈচিত্র্যের ছাপ। ধামাইল নৃত্যের মাধ্যমে ফুটে ওঠে গ্রাম বাংলার চিরায়ত নারী-সংস্কৃতি। মণিপুরি নৃত্যের লালিত্য, বিহুর চঞ্চলতা আর ত্রিপুরার হাজাগিরি কিংবা চা-জনজাতির ঝুমুর নৃত্য—সব মিলিয়ে মঞ্চে যেন এক খণ্ড ‘মিনি নর্থ-ইস্ট’ ফুটে উঠেছিল। মিজোরামের বাঁশনৃত্য (ব্যাম্বু ডান্স) তার নিখুঁত ছন্দ আর ভারসাম্যে দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রতিটি পরিবেশনাই ছিল এক একটি জনজাতির জীবন দর্শনের প্রতিফলন।
উৎসবের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল ভিন্নভাবে সক্ষম শিল্পীদের অসাধারণ পারফরম্যান্স। তাঁদের সাহস ও প্রতিভাকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানায় শ্রীভূমি। চোখের কোণে আনন্দাশ্রু নিয়ে অনেক দর্শকই অনুভব করেন যে, শিল্পের আঙিনায় সবাই সমান। শিশুদের চপল উপস্থিতি আর আত্মবিশ্বাসী পদচারণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়ে যায়।
কেআরসি ফাউন্ডেশনের ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও সিইও বিশ্বদীপ গুপ্তের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এক সমাবেশ ঘটেছিল। শ্রীভূমি পুরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্র চন্দ্র দেব, প্রাক্তন চেয়ারম্যান মিশন রঞ্জন দাস, রবীন্দ্র সদন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ড. শর্মিষ্ঠা খাজাঞ্চি, সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী, অঞ্জন গোস্বামী প্রমুখ এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন অসিত দত্ত। আয়োজক কমিটির পক্ষে অমর কৃষ্ণ সাহা ও মৃত্যুঞ্জয় চক্রবর্তী আমন্ত্রিত অতিথিদের উত্তরীয়, স্মারক ও চারাগাছ দিয়ে বরণ করে নেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে ‘খুশি কালচারাল অর্গানাইজেশন’-এর উদ্বোধনী সংগীত থেকে শুরু করে শুভশ্রী নাথ, সুস্মিতা চক্রবর্তী, বন্দনা দাসদের একক গান এবং ‘সমন্বয় সংগীত বিদ্যালয়’ ও ‘সপ্তসুর’-এর সমবেত গান দর্শকদের মোহিত করে।
নৃত্য পরিবেশনায় ছিল আদর্শ বিদ্যালয় (পাথারকান্দি), যোগাসন ট্রেনিং সেন্টার, বিশ্ব বীণা কালচারাল অর্গানাইজেশন, নূপুর নৃত্যালয় এবং নৃত্যশ্রী কলানিকেতনের নিপুণ শৈলী। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন শ্রাবণী পাল।
আলো নিভে যাওয়ার পর অনুষ্ঠান শেষ হলেও, শ্রীভূমির মানুষের মনে সেই রেশ থেকে গেছে। কেউ গুনগুন করছিলেন লোকগানের সুর, কেউ আবার আলোচনা করছিলেন বাঁশনৃত্যের ছন্দ নিয়ে। বরাক উৎসব ও এনইআইআর ২০২৬ কেবল বিনোদন দেয়নি, বরং এক অস্থির সময়ে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি আর আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। শ্রীভূমির এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনই হোক আগামীর পাথেয়।


Promotional | North East Integration Rally



