নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেলেন ধলাইর দিপালী দাস
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শিলচর। অসমে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রাপ্তির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল বরাক উপত্যকা। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে অবশেষে ভারতীয় নাগরিকত্বের শংসাপত্র হাতে পেলেন কাছাড় জেলার ধলাইর বাসিন্দা দিপালী দাস।
বুধবার শিলচরে তাঁর হাতে এই বহুপ্রতীক্ষিত সংশাপত্র তুলে দেওয়া হয়। সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ায় দিপালী দাসের পরিবারে এখন খুশির আমেজ, বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে মানসিক রোগে আক্রান্ত তাঁর স্বামী অভিমন্যু দাসের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে গভীর তৃপ্তি।
উল্লেখ্য, দিপালী দাসের এই যাত্রাপথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ছিল। পুলিশের কেস রেফারেন্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিলেট জেলার দীপপুর গ্রামের বাসিন্দা দিপালী ১৯৮৭ সালে অভিমন্যু দাসের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন এবং ১৯৮৮ সালে ভিটেমাটি ছেড়ে সপরিবারে আসামে চলে আসেন। তাঁরা ধলাইর হাওয়াইথাং এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
১৯৯৭ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি আইনি জটিলতায় পড়েন এবং তাঁকে শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হয়। ২০২১ সালের ১৭ মে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্তি পেলেও প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ধলাই থানায় হাজিরা দিতে হত। এই অপমান ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) দ্বারস্থ হন।
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শিলচরের বিশিষ্ট আইনজীবী ধর্মানন্দ দেবের বাসভবনে বসে অনলাইনে সিএএ-র অধীনে আবেদন জানান দিপালী দাস। এরপর গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি শিলচর সুপারিন্টেনডেন্ট অব পোস্ট অফিসে তাঁর প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ধাপে ধাপে আরও দু’টি শুনানির পর তাঁর যাবতীয় নথিপত্র কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়।
মে মাসের ১২ তারিখ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরের আধিকারিকরা তাঁর হাওয়াইথাংয়ের বাড়িতে গিয়ে সরজমিনে তদন্ত ও ভেরিফিকেশন শেষ করেন। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে শেষবারের মতো পোস্ট অফিসে ডাকা হয় এবং আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে নাগরিকত্বের শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
এই আইনি লড়াইয়ে দিপালী দাসের প্রধান সহযোগী ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব এবং সমাজকর্মী কমল চক্রবর্তী। তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই প্রক্রিয়াটি সফল রূপ পাওয়ায় শহরের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকরা তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েছেন।
দিপালী দাসের এই সাফল্য কেবল তাঁর একার নয়, বরং তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎকেও নিষ্কণ্টক করল। তাঁর পুত্র আদিত্য এবং চার কন্যা— অর্পিতা, নিবেদিতা ও জয়শ্রী সহ পরিবারের মোট ছয় সদস্যের নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন উঠলে, মায়ের এই শংসাপত্রই রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
দীর্ঘদিন ধরে মাথার ওপর ঝুলে থাকা বিদেশি তকমা মুছে যাওয়ায় দিপালী দাস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, এই দিনটির জন্যই তিনি এবং তাঁর পরিবার চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিলেন। এখন অন্তত নির্ভয়ে নিজের দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।



