গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের ১২৫ বছর স্মরণ-অনুষ্ঠান

2 - মিনিট |

পিঁপড়ে, মাকড়শা, ব্যাঙাচি, বাদুড়— আজন্ম এগুলোই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। কম বয়সেই চারপাশে দেখা ছোট্ট ছোট্ট প্রাণীর আলোকচিত্র তুলতে শুরু করেন। সেই নেশা তাঁকে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল এই ক্ষেত্রে গবেষণার শিখরে

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের পয়লা আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির লোনসিং গ্রামে এক দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছিলেন। বাবা অম্বিকাচরণ ভট্টাচার্য একজন গ্রাম্য পুরোহিত ও মা শশীমুখী দেবী একজন গৃহবধূ ছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে বাবা মারা যান। দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁর শৈশব কাটে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করার পর গোপালচন্দ্র ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কলেজে আই.এ. পড়ার জন্য ভর্তি হন। অর্থের অভাবে তাঁর পাঠ্যক্রম শেষ করা হল না। এর পর তিনি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকের দায়িত্ব পান। এই সময় তিনি সাহিত্যচর্চায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন, পালা গান ও জরি গানে ইত্যাদি লোকগীতির জন্য গান রচনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন।

এহেন বিরল প্রতিভা প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (১ অগস্ট ১৮৯৫ – ৮ এপ্রিল ১৯৮১)। নিরলস গবেষণায় উন্মোচন করেন কীটপতঙ্গের জীবনরহস্য ও উদ্ভিদকুলের অজানা দিক। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে আকর্ষক করার কাজেও তিনি অগ্রণী। বোস ইনস্টিটিউটে সুদীর্ঘ গবেষণাজীবনে তাঁর ২২টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। লিখেছেন বাংলার কীটপতঙ্গ, বাংলার গাছপালা, বাংলার মাকড়সা-সহ নানা বই ও বহু প্রবন্ধ। পেয়েছেন নানা সম্মান। ‘গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞানপ্রসার সমিতি’ ও ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের’ যৌথ উদ্যোগে তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী ১ আগস্ট পালিত হবে পরিষদ ভবনে সকাল সাড়ে দশটা থেকে।

অনেক গল্প আছে গোপালবাবুর কীর্তিতে। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন।  সেই সময় ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘জৈবদ্যুতি‘ নামে তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তা জগদীশচন্দ্র বসুর নজরে আসে। জগদীশচন্দ্র তাঁকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দিরে মেরামতির কাজে নিযুক্ত করেন। এই প্রতিষ্ঠানে থেকেই তিনি জীববিদ্যার ওপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উদ্ভিদের জীবনের ওপর তাঁর গবেষণা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এরপর জৈব-আলোকবিদ্যার ওপর তাঁর বিভিন্ন গবেষণা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও ধীরে ধীরে কীট পতঙ্গের ওপর তাঁর আগ্রহ জন্ম নেয়। এই সময় তিনি আলোকচিত্রগ্রাহক হিসেবে দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে বোস 

ইসস্টিটিউটের পত্রিকায় তিনি দেখান যে পিঁপড়ে ও মৌমাছির মতো সামাজিক কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রে কিভাবে রাণী লার্ভার খাদ্যের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সঠিক ভাবে পরিবর্তন করে অন্য রাণী, কর্মী ও সৈনিক পতঙ্গ সৃষ্টি করেন। পিঁপড়ের জন্য স্বচ্ছ বাসা বানিয়ে চুপচাপ নিরীক্ষণ করে তিনি এই পর্য্যবেক্ষণ করেন। পতঙ্গদের প্রাকৃতিক বস্তুর ব্যবহারের ওপরও তাঁর গবেষণা নিবদ্ধ হয়। তিনি লক্ষ্য করেন, কিভাবে শিকারী বোলতা তাদের বাসার মুখ বন্ধ করার জন্য ছোট ছোট পাথরের টুকরো ব্যবহার করে থাকে। প্রজননকালে ঘুরঘুরে পোকা কি ভাবে শিকারীদের আক্রমণ থেকে তার ডিমগুলিকে রক্ষা করার জন্য পেছনের পা দিয়ে কাদার তৈরী গোলক তৈরি করে, তা তিনি পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া ব্যাঙাচি থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিবর্তনের সময় কিছু ব্যাক্টেরিয়ার উপকারিতা সম্বন্ধেও তিনি গবেষণা করেন। ব্যাঙাচির ওপর পেনিসিলিন ওষুধ প্রয়োগ করে তিনি লক্ষ্য করেন যে, সেগুলি পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিবর্তিত হতে সক্ষম হয় না।

তাঁর প্রায় বাইশটি গবেষণাপত্র প্রাকৃতিক ইতিহাস সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সামজিক কীটপতঙ্গের ওপর তাঁর গবেষণা সম্বন্ধে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য প্যারিসের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য স্টাডি অব সোশ্যাল ইন্সেক্টস’ নামে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি ডাক পান। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার জন্য তাঁকে বিভিন্ন সময়ে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। আধুনিক প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অপরিচিত এই বিজ্ঞানী। প্রবীনরাও ভুলতে বসেছেন। এই প্রেক্ষিতে তাঁর ১২৫ বছর স্মরণ-অনুষ্ঠান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *