স্মারক বক্তৃতা-র আয়োজক সমিতির সভাপতি রূপম গোস্বামীর পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত আলোচনাচক্রে অন্যদের মধ্যে প্রয়াত দয়ালকৃষ্ণ বরার জীবন-দর্শন নিয়ে বক্তব্য পেশ করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের উত্তর অসম প্রান্ত বৌদ্ধিক প্রমুখ শংকর দাস কলিতা
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
উগ্র অসমিয়া ভাষিক জাতীয়তাবাদীদের কবলে পড়েছে অসম। এ থেকে অসমিয়া সমাজকে উদ্ধার না করলে যতটুকু আছে তারও শ্মাশানযাত্রা হবে। বলেছেন বিশিষ্ট নিবন্ধকার তথা শিক্ষাবিদ ড. জয়কান্ত শর্মা। রবিবার গুয়াহাটির পূর্ত বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মিলনায়তনে ‘আচার্য দয়ালকৃষ্ণ বরার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্মারক বক্তৃতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে সাম্প্রতিক-অসমের চিত্র তুলে ধরেছেন প্রধান বক্তা ড. শর্মা।
স্মারক বক্তৃতা-র আয়োজক সমিতির সভাপতি রূপম গোস্বামীর পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত আলোচনাচক্রে অন্যদের মধ্যে প্রয়াত দয়ালকৃষ্ণ বরার জীবন-দর্শন নিয়ে বক্তব্য পেশ করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের উত্তর অসম প্রান্ত বৌদ্ধিক প্রমুখ শংকর দাস কলিতা, প্রবীণ শিক্ষাবিদ তথা প্রয়াত বরার অন্যতম সহযোদ্ধা প্রবীণ শিক্ষাবিদ সুধীরকুমার দাস, সঞ্জয় গোস্বামী, রজতচন্দ্র ভরালি প্রমুখ।
ভিড়ে ঠাসা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘অসমের আর্থ-সামাজিক স্থিতি এবং বর্তমান প্রজন্মের ভবিষ্যত’ শীর্ষক আলোচনাচক্রের প্রধান বক্তা ড. জয়নাথ শর্মা অসমিয়া যুবসমাজ আজ কর্মবিমুখ হয়ে পড়েছে দেখে আক্ষেপ ব্যক্ত করেছেন। এর পিছনে প্রকারান্তরে তিনি ৭৯-এর ছাত্র আন্দোলনকে দায়ী করেছেন। বলেন, ছাত্ররা পড়াশুনা করবে। তা না করে জাতি রক্ষার নামে আন্দোলনে নেমে পড়েছে তারা। তবে যাদের মদতে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য যে কিছুটা সফল হয়েছে তা-ও বলেছেন বক্তা।
অসমিয়া যুবসমাজের কোমর ভেঙে দেওয়াই যে আন্দোলনের মদতদাতাদের উদ্দেশ্য ছিল তারও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। বলেন, ছয় বছরের আন্দোলনের পর ওই সব ছাত্র দশ বছর অসমে রাজত্ব করেছে, সুফলের বদলে কুফলই লাভ করেছেন অসমের মানুষ। কর্মবিমুখ যুবসমাজের এক অংশ আন্দোলনকে তাদের জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করার ধারা এখনও বিদ্যমান।
জোরের সঙ্গে তিনি দাবি করেন, উগ্র অসমিয়া ভাষিক জাতীয়তাবাদীদের কবলে পড়েছে অসম। ভাষা বিপন্ন বলে আওয়াজ তুলে নিজের পায়ে নিজেরা কুড়োল মারছে তথাকথিত অসমিয়া আন্দোনকারীরা। ইতিহাস টেনে বলেন, এ-ধরনের ভাষা ভাষা করার ফলে ইতিমধ্যে অসম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে নাগাল্যান্ড। এভাবে আলাদা হয়ে গেছে মিজোরাম, মেঘালয়ও। এখন আবার সেই ভাষার জিগির? এদের প্ররোচনা থেকে দূরে থাকার ডাক দিয়েছেন ড. শর্মা।
আক্রমাণাত্মক ড. জয়নাথ বলেন, ‘বিদেশি খেদিব লাগিব’ বলে যে-সকল ছাত্রনেতা অসমিয়াদের আবেগ নিয়ে খেলেছিলেন, তাঁরা দশ বছর রাজপাট উপভোগ করেছেন, দিলেন কী অসমিয়াদের? এত বছর পর আবার জিগির তোলা হচ্ছে বিদেশি খেদাবেন। এখন আবার কেন, প্রশ্ন তুলে বলেছেন, যা ধ্বংস করার করে দেওয়া হয়েছে। তাই তাঁর আহ্বান, এ-সব উসকানির ফাঁদে না পড়ে অসমকে রক্ষা করতে শুভবুদ্ধি সম্পন্নদের জোটবদ্ধ হতে হবে।
কেননা, অসমের সব কিছুই প্রব্রজনকারীদের কবলে চলে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজারের শাক-সবজি, মাছ-মাংস বিক্রেতা, নির্মাণশ্রমিক ইত্যাদিকে কবজা করা হয়েছে। আর অসমিয়া যুবসমাজ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসেছে। তাছাড়া একাংশ যুবসমাজ উচ্চশিক্ষার জন্য বহিঃরাজ্যে পাড়ি দিয়ে আর দেশে না ফেরায়ও যে অসমের ক্ষতি হচ্ছে তার বর্ণনাও করেছেন বক্তা।
অসম কৃষিনির্ভর রাজ্য। অসমিয়াদের আজ চাষবাসেও মন নেই। এর কারণও বলেছেন মূল বক্তা ড. শর্মা। এর জন্য সরাসরি না বলে তিনি বিদেশি অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের প্রসঙ্গ টেনেছেন। বলেন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ওই সব শ্রমিকরা কম মজুরিতে বেশি শ্রম করে অসমিয়াদের পঙ্গু করে দিয়েছে। বক্তা বলেন, অসমে ৭৫ প্রজাতির বাঁশ উৎপাদন হয়, আঁখের জন্য উর্বর জমি রয়েছে। সে-ক্ষেত্রে দুটি কাগজ কল, চিনি কল, বস্ত্র কল বন্ধ হয়ে গেছে। এর পিছনেও সেই কর্মবিমুখতাকে দায়ী করেছেন তিনি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে সচল করতে বেসরকারি খণ্ডে হস্তান্তরের প্রসঙ্গ উঠলেই হেই-হেই-রে-রে করে ওঠেন আন্দোলনজীবীরা।
কেবল তা-ই নয়, নদীবাঁধের নামেও আন্দলনজীবীরা রাজ্যের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তা করে অসমকে ভয়ংকর পরিণতির দিকে যে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে তা যুবসমাজের প্রাশাপাশি সর্বসাধারণকে বোঝানোর পরামর্শ দিয়েছেন ড. জয়নাথ শর্মা। বলেন, সর্বাগ্রে যুবসমাজের মাইন্ডসেট তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁদের কাছে বিষয়গুলি সম্পর্কে ইতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরতে হবে। অ্যাক্ট-ইস্ট পলিসির বলে অসমের যে কী পরিমাণ লাভ হবে তা-ও তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে। বোঝাতে হবে, অসমেই রয়েছে কর্মসংস্থানের অপার সুযোগ। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। জয়নাথ শর্মা বলেন, তিনি দেখছেন, রাজ্যের অধিকাংশ মানুষের মনে এখন পরিবর্তন এসেছে। এটা শুভলক্ষণ। পরিবর্তন আসবেই, আশাবাদী তিনি।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আজীবন প্রচারক তথা বৈষ্ণবপণ্ডিত, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নিবন্ধকার, কবি, ঔপন্যাসিক এবং একশরণ ভাগবতী সমাজের আচাৰ্য দয়ালকৃষ্ণ বরার জীবনাবসান ঘটেছিল। আজ তাঁরই প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।


