জঙ্গল থেকে পালিয়ে বাঁচলেন করিমগঞ্জ কলেজের অপহৃত অধ্যক্ষ মতিউর রহমান খান

3 - মিনিট |

বিগত ১০-১২ বছর থেকে অপহরণ, খুন সংক্রান্ত ঘটনা বেড়েই চলেছে ভাঙ্গা এলাকায়। ভাঙ্গার শম্ভু দাস অপহরণ ও খুনের পর নাজ অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড, তোফায়েল হত্যাকাণ্ড, হাবিবুল খুন-সহ প্রায় ৩০/৩৫টি খুনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

অপহরণের বারো ঘণ্টার মধ্যে দোহালিয়ার গভীর জঙ্গল থেকে অদম্য সাহসের বলে অপহরণকারী‌দের বেষ্টনী থে‌কে পালিয়ে বাঁচ‌লেন করিমগঞ্জ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. মতিউর রহমান খান। করুণাময়ের আশীর্বাদ আর ভাগ্য সহায় ছিল বলেই আজ দুষ্কৃতীদের খপ্পর থেকে জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছেন, বলেছেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ খানের পরিবারের সদস্যরা। রক্তাক্ত অবস্থায় পাথারকান্দির মধুরবন্দ এলাকা থেকে রবিবার ভোরের দিকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য পাথারকান্দি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার ডাক্তাররা তাঁর শরীরের আঘাতপ্রাপ্ত স্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ করে ওষুধপত্র দেন।

তবে আঘাত গুরুতর থাকায় নিয়ে আসা হয় করিমগঞ্জ সিভিল হাসপাতালে। এখানে ডা. গৌতম রায়শর্মা তাঁর চিকিৎসা করেন। তাঁর গলা ও পেটের তলদেশ থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ-সব ক্ষতে পুনরায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। 

করিমগঞ্জ পুলিশ অপহরণের শিকার আহত মতিউর রহমানের বয়ান হাসপাতালেই রেকর্ড করেছে। তার পর তাঁকে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন কর্তব্যরত ডাক্তার গৌতম রায়শর্মা। এআইউডিএফ নেতা আব্দুল আজিজ খবর পেয়েই সিভিল হাসপাতালে ছুটে আসেন এবং নিজের গাড়ি করে ড. মতিউর রহমানকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেন। গাড়িতে বসেই অপহরণের সম্পূর্ণ ঘটনাবলি শোনান মতিউর রহমান।

সহজ-সরল স্বভাবের মিষ্টভাষী ড. মতিউর রহমান খান করিমগঞ্জ কলেজের আরবি বিভাগের প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন হন এবং ২০১৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ভাঙ্গার কাজিরগ্রামে তাঁর আদিনিবাস। সম্প্রতি মহাকাল এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণ করছেন। নির্মাণকার্য দেখাশোনার জন্য প্রতিদিনই মহাকল যাতায়াত করেন। যথারীতি গতকালও গিয়েছিলেন। 

তিনি জানান, শনিবার তখন সন্ধে ৬-টা ৩০ মিনিট।  বাড়ি ফিরবেন বলে গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন জাতীয় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে। এমন সময় একটি মারুতি অল্টো কার এসে তাঁর সামনে দাঁড়ায়। গাড়িতে দুজন অজ্ঞাতপরিচয় যুবক মতিউর রহমানকে স্যার বলে সম্বোধন করে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করে। গন্তব্যের কথা শুনে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে গাড়িতে উঠতে অনুরোধ করে তারা। এদের বিনয়ী কথা শুনে মতিউর ভেবেছিলেন হয়তো এরা তাঁরই ছাত্র। তাছাড়া এইসব এলাকার অনেক পড়ুয়াই তাঁকে স্যার বলেই সম্বোধন করে থাকে। তাই তিনি কোনও কিছু না ভেবেই গাড়িতে উঠে পড়েন। 

গাড়িটি নন্দপুর এলাকা অতিক্রম করতেই তাঁর মনে খটকা লাগে। গাড়ির গতি ছিল তীব্র। নন্দপুরেই নামিয়ে দিতে বললে যুবকদ্বয় তাঁকে পেছনের সিটে চেপে ধরে তারা। চিৎকার করলে গুলি করে দেবে বলে হুমকিও দেয়। তার পর তাঁকে পেছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে ইনজেকশনের সিরিঞ্জ দিয়ে পেটে কিছু পুশ করে। তিনি শুধু এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে তাঁকে করিমগঞ্জ বাইপাস দিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে কোনও এক জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তাঁর হাত চোখ বেঁধে দেয় দুষ্কৃতীরা। তিনি বার বার তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা কোনও কথাই শুনতে চায়নি। দুষ্কৃতীদের মুখে একটাই কথা টাকা দিলে ছেড়ে দেব। কিন্তু টাকার অঙ্কটা বলেনি। তাঁর সঙ্গে মজুত মোবাইল ফোন ও নগদ প্রায় তিন হাজারের মতো টাকাও ছিনিয়ে নিয়েছে দুষ্কৃতীরা। 

ততক্ষণে রাত অনেক গভীর হয়েছে বলে বুঝতে পারেন মতিউর। দুষ্কৃতীদের একজন অন্যজনকে পাহারায় রেখে চলে যায়। প্রহরারত দুষ্কৃতী মতিউর রহমানকে একটি গাছের সঙ্গে কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে গেলে তিনি জীবনবাজি রেখে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। ভাবলেন, মরতে যখন হবেই তখন না-হয় লড়াই করেই মরি। আচমকা এক ঝটকায় নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে হাতদুটো বাধঁনমুক্ত করে পালাতে থাকেন। কোথায় কোন দিকে যাচ্ছেন, কোনও হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। 

এদিকে একের পর এক পাহাড়ি টিলা অতিক্রম করতে করতে রাত প্রভাত হওয়ার পথে। ভোরের আলোয় তিনি একটি বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেটা পাথারকান্দি এলাকার মধুরবন্দ এলাকার কোনও এক গ্রাম। সেখানকার স্থানীয়দেরকে নিজের পরিচয় দেন তিনি। সেখানকারই এক ব্যক্তি জনৈক চন্দন নাথ তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। সারা রাতের উপবাস আর শারীরিক ধকলে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ অধ্যক্ষ। সেখান থেকেই কেউ তাঁর বাড়িতে খবর দেয় এবং বাড়ি থেকে ছেলে ও আত্মীয়রা সঙ্গে সঙ্গে পাথারকান্দি ছুটে যান। পাথারকান্দি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করানো হয় এবং সেখানে পুলিশও তাঁর বয়ান রেকর্ড করে। 

অপহরণের ঘটনা যেহেতু বদরপুর থানা এলাকায় সংঘটিত হয়েছে তাই মামলাও বদরপুর থানায় দায়ের করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী রাতেই বদরপুর থানায় অপহরণের মামলা দায়ের করেছেন ড. মতিউর রহমান বলে জানা গেছে।
এদিকে এই অপহরণ কাণ্ডের প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসছেন বদরপুর বিধানসভা এলাকার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। বিগত ১০-১২ বছর থেকে অপহরণ, খুন সংক্রান্ত ঘটনা বেড়েই চলেছে ভাঙ্গা এলাকায়। ভাঙ্গার শম্ভু দাস অপহরণ ও খুনের পর নাজ অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড, তোফায়েল হত্যাকাণ্ড, হাবিবুল খুন-সহ প্রায় ৩০/৩৫টি খুনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তবুও প্রশাসনের ঘুম ভাঙছে না।

এই অভিযোগ করে বদরপুর এলাকায় অপরাধ দমনে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এআইউডিএফ নেতা আব্দুল আজিজ। তিনি আজ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বৃহত্তর বদরপুর এলাকায় অপরাধমূলক প্রবণতা দিন-দিন বেড়েই চলেছে। বদরপুরে সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক দিশা দেখাতে সময় থাকতে এ-সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান আব্দুল আজিজ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *