যে কোনও সময় ঘুমিয়ে পড়ার বিরল ক্ষমতা রাখেন কালাচি গ্রামের অধিবাসীরা
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
অনিদ্রায় যাঁরা ভুগছেন, নিদ্রাদেবী যাঁদের প্রতি ক্রমাগত অসন্তোষ প্রকাশ করে ধরা দিচ্ছেন না, ঘুমের ওষুধ, উলটোদিক থেকে সংখ্যা গোনা (১০০, ৯৯, ৯৮…), মাঠে চড়া ভেড়া গোনা, মনোবিদের আশ্রয় নেওয়ার মতো সবকিছুর পরও চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠে ঘুমের দেখা মিলছে না, তাঁদের কাছে আদর্শ জায়গা হতে পারে কাজাখস্তানের এসিল জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম কালাচি। এই গ্রামটির সকল গ্রামবাসীই যেন এক একজন কুম্ভকর্ণ। শুধুমাত্র কর্মব্যস্ত দিন শেষ করার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ার পর নয়, চলতে-ফিরতে, আলাপচারিতার সময়, কাজ করার সময়, অর্থাৎ যে কোনও সময় ঘুমিয়ে পড়ার বিরল ক্ষমতা রাখেন কালাচি গ্রামের অধিবাসীরা। ঘুমের বিষয়ে তাঁদের কোনও সময়-অসময় নেই, নেই ক্লান্তিও। এমনকী ঘুম থেকে উঠেও ঘুমিয়ে পড়তে পারেন তাঁরা। অবশ্য শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখিরাও এই ঘুমের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
কোনও কোনও সময় দেখা যাচ্ছে পুরো কালাচি গ্রামটাই নিদ্রামগ্ন। কারও ঘুম ভাঙছে ছয়-সাত ঘণ্টা পরে। কেউ কেউ ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছেন টানা তিন-চার দিন! আর এই ঘটনা আচমকা নয়, ঘটে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। গ্রামবাসীদের এই ঘুমিয়ে পড়াই গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে। অখ্যাত ছোট্ট গ্রাম কালাচি এখন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঘুমিয়ে পড়ার এই ঘটনা প্রথম নজরে আসে ২০১৩ সালে। ঘুম ভাঙলেও বিপত্তির শেষ নেই। থেকে যায় অনেক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসকদের মতে, ঘুম মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করে। কিন্তু কালাচি গ্রামবাসীদের ক্ষেত্রে এই ঘুম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ ঘুম ভাঙলেই দেখা দিচ্ছে বিপত্তি। শুরু হচ্ছে নতুন উপদ্রব। দেখা দিচ্ছে অনেক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের সবার চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে এই ঘুম। দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পর জেগে উঠলেই শুরু হচ্ছে মাথা ব্যথা, সঙ্গে বমি-বমি ভাব। এই সব উপসর্গ সপ্তাহ জুড়েও থেকে যাচ্ছে কোনও কোনও সময়। কারও কারও মাত্রাহীনভাবে রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। হ্যালুসিনেশনের পাশাপাশি অনেকের স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এই ঘুমের কারণ কী? এ নিয়ে চিকিৎসকরা সঠিক কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাঁদের সন্দেহ ছিল গ্রামবাসীরা হয়তো কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিজ্ঞানী, রেডিওলোজিস্ট, টক্সিকোলোজিস্ট, সবাই একে একে কালাচি গ্রামে এসে ঘুমের কারণ খুঁজতে থাকেন। পরীক্ষা করা হয় গ্রামের জল ও মাটির।
ইতিমধ্যে গ্রামবাসীদের ব্রেনের স্ক্যান করে তাঁদের মস্তিষ্কে অতিরিক্ত তরল পদার্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে ‘ইডিমা’ বলে। যদিও ওই ইডিমা-র সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। এদিকে, কালাচি গ্রামের বাসিন্দাদের সন্দেহ, তাঁদের এই ঘুমের পিছনে রয়েছে পাশের গ্রাম ক্রাসনোগর্ক্সে অবস্থিত ক্রাসনোগোরস্কি ইউরেনিয়াম খনির বাতাস। ক্রাসনোগর্ক্সেই ছিল খনিশ্রমিকদের বাসস্থান। সেই গ্রামেও ঘুমের প্রভাব ছিল বলে জানা গিয়েছে। যদিও সোভিয়েত যুগের ওই খনি ১৯৯০-তেই বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি বিকিরণ পরীক্ষা করে দেখা যায় খনির ভিতর ও চার পাশের জায়গার রেডিয়েশনের পরিমাণ বেশি নয়। বিপদসীমা পার হয়নি।
অবশেষে ২০১৫ সালে সামনে আসে প্রকৃত কারণ। বিজ্ঞানীরা দেখেন রেডিয়েশন নয়, এই ঘুমের কারণ সেখানকার বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোকার্বনের অতিরিক্ত উপস্থিতি। কার্বন মনোক্সাইড অক্সিজেনের তুলনায় ২০০ গুণ দ্রুত রক্তে মেশে। ফলে শরীরে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছতে দেয় না। অক্সিজেনের অভাবেই মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন বহু ঘণ্টার জন্য। ইউরেনিয়াম খনি থেকেই নির্গত হতো কার্বন মনোক্সাইড। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও এই গ্যাস কীভাবে উৎপন্ন হচ্ছে তার কোনও সঠিক উত্তর মেলেনি।



