বিশেষ নিবন্ধ: হাফলং হিন্দি

3 - মিনিট |

এক অনন্য পরিচয় ও সেতুবন্ধনের ভাষা

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

অনুপ কুমার বিশ্বাস

হাফলং : ‘হাফলং হিন্দি’। দুটি শব্দের সমন্বয়ের একটি ছোট বাক্য। কিন্তু দুটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক আবেগ-আবদার, ভালবাসা, ভাবের আদান প্রদান কত কি! যার নামের মধ্যেই আছে পরিচয়। অসমের একমাত্র পার্বত্য জেলা ডিমা হাসাও (সাবেক নর্থ কাছাড় হিলস্)-র অন্যতম বিশেষ যোগাযোগ তথা মনের ভাবপ্রকাশের ভাষা। এটি হিন্দির একটি ‘পিজিন’ রূপ, অর্থাৎ সরলীকৃত সংস্করণ, যাতে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির শব্দ ও প্রভাব মিশ্রিত রয়েছে। এই ভাষার নামকরণ হয়েছে জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র শৈল শহর হাফলং-এর নামানুসারে।

হাফলং হিন্দির ব্যাকরণ প্রথাগত হিন্দির তুলনায় অনেক সহজ ও সরল। উদাহরণ স্বরূপ, এতে ক্রিয়াপদের সঙ্গে সর্বনাম বা বাচকের জন্য পৃথক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়না এবং অতীতকাল বা নির্দিষ্ট কালধারায় কারক চিহ্নের ব্যবহারও সীমিত। স্থানীয়ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব এই ভাষাকে এক অনন্য ও প্রাণবন্ত চরিত্র প্রদানে সক্ষম হয়েছে।

এই ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ডিমা হাসাও জেলার বিভিন্ন জাতি জনগোষ্ঠী যেমন ডিমাসা, নাগা, কুকি, মার, রাঙ্খল, বেইটে তথা বাঙালি, অসমীয়া, নেপালি, মণিপুরি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যের মধ্যে থাকা একতার প্রতীকস্বরূপ। তাছাড়া ভাষার শব্দভাণ্ডার ও উচ্চারণের ভিন্নতা থেকে সহজেই কথোপকথনকারী কোন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভক্ত বোঝা যায়।

হাফলং হিন্দির সৌন্দর্য-এর স্বাধীনতায়। এটি কঠোর ব্যাকরণিক নিয়মে বাঁধা নয়, বরং বক্তারা তাদের স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক বন্ধন এই ভাষার মাধ্যমে মুক্ত ভাবে প্রকাশের সুবিধা পেয়েছেন। ভারতের অনেক শহরে বিশুদ্ধ হিন্দির পরিবর্তে স্থানীয় ভাষার সঙ্গে হিন্দির মিশ্র রূপ প্রচলিত, আর হাফলং তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যেমন বাংলায় যদি বলি ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ? তা হাফলং হিন্দিতে হবে’ তুম কঁহা যাতা’?

অনুরূপ আমি খাবার খেয়েছি’। হাফলং হিন্দিতে বলা হবে ‘হম খানা খায়া’। সহজ ও সরল ভঙ্গির ভাষার মধ্যে সর্বদা এক ভিন্ন আবেগ জড়িয়ে থাকে। যা কথোপকথনকারীরা ঠিক অনুভব করতে পারেন। রাগের বর্হিপ্রকাশেও হাফলং হিন্দির ক্ষেত্রে অনুরূপ বেশ মজাদার শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। হাফলং শহরের অধিকাংশ বাঙালিরা সাধারণত ‘হাফলং হিন্দি’তে কথা বলেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যা এক ছোট্ট সমীক্ষায় ধরা পড়েছে।

এমনকি দুই বাঙালি যুবক বা যুবতির মধ্যেও কথাবার্তার ক্ষেত্রে ‘হাফলং হিন্দি’র প্রচলন উল্লেখনীয়। তা শুধু বাড়ির বাহিরে নয়, ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেও হাফলং হিন্দি সমাদৃত। রয়েছে এক আলাদা স্থান। হাফলং হিন্দিকে উপলব্ধি করতে হলে এখানকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতিকেও জানতে হবে।

হাফলং হিন্দির বীজ সেই ১৮০০ সালের শেষ দিকে পোঁতা হয়েছিল। যখন ব্যবসায়ী ও নির্মাণ শ্রমিকদের মাধ্যমে হিন্দি এই অঞ্চলে পৌঁছয়। স্থানীয়রা এটিকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরলীকৃত করে নেন, যার ফলে আজকের হাফলং হিন্দির জন্ম। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংমিশ্রণে এই ভাষায় এক ঐতিহাসিক ছোঁয়া যোগ করেছে। এটি শুধু ভাষা নয়, বরং ডিমা হাসাওর বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্রিত করার এক সেতু স্বরূপ।

হাফলং হিন্দি কেবল একটি ভাষা নয়, এটি ডিমা হাসাওর বহু ভাষিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক স্বরূপ। স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা এই ভাষা আজও জীবন্ত এবং ক্রমবিকাশমান। এর সরলতা এবং বহুভাষিক মিশ্রণ এটিকে এক ব্যতিক্রমী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতি বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ ভিএলটি বাপুইর দৃষ্টিতে ‘হাফলং হিন্দি’ একটি আঞ্চলিক ভাষা যদিও কিন্তু বৃহত্তর ডিমা হাসাও জেলার ভিন্ন ভাষাভাষি ও সমাজের মধ্যে সেতু বন্ধনের কাজ করছে। হাফলং হিন্দি বিভিন্ন জাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংযোগ ঘটাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। উনিশটি জাতি-জনগোষ্ঠীর মানুষের মনের ভাবের আদান প্রদানের অন্যতম মাধ্যম।

বাপুইর মতে হাফলং হিন্দি কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি ভাষা নয়। বরং পার্বত্য জেলার স্থানীয় আদিবাসী ভাষা, হিন্দি, বাংলা ও নেপালি ভাষার মিশ্রিত রূপ। যার ব্যাকরণ মূলত টিবেটো-বার্মা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে এতদঞ্চলের কথ্য ভাষা হিসেবে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং থাকবেও। কারণ জেলার যে কোনও প্রান্তে হাফলং হিন্দি বহুল প্রচলিত এবং প্রসারিত। যা বহুজাতিক সমাজ ও সংলাপের জন্ম দিয়েছে।

বাপুই বিশ্বাস করেন, হাফলং হিন্দির সবচেয়ে বড় গুণ হল এখানকার মানুষদের ভাষায় ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সেতুবন্ধন। তাঁরমতে, ‘প্রকৃত হাফলং হিন্দি’ কোনো লিখিত আদর্শে বাঁধা নয়; এটি স্থানীয় শব্দ, উচ্চারণ ও অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেনে বদলাতে থাকে। বাপুই-এর ভাষাগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, এই ভাষা শিক্ষার জন্য তার তৈরী ‘প্রাইমার’ বই সর্বজনীনতা এবং সামাজিক সহমর্মিতার এক দৃঢ় ভিত্তি।

তাঁরমতে, হাফলং হিন্দি শুধু ভাষা নয়, এট অসমের ডিমা হাসাও অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক; বহুসংস্কৃতি, বহুভাষা ও বিস্তৃত ঐত্যিহ্যের প্রাণ। বাপুই চান, এই ভাষার পাঠ ও চর্চা এখানে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক ও সাম্যচেতনা প্রতিষ্ঠা করুক।

লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মুখ্য সম্পাদক, ট্রাইবাল ভয়েজ, হাফলং

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *