বাংলা ভাষার একাদশ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শিলচর রেলুয়ে স্টেশন
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শিলচর : গত ২৪ অক্টোবর ২০২৫ আসামের মুখ্যমন্ত্রী শিলচর মেডিকেল কলেজে সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল বিল্ডিং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সহ বরাকের উন্নয়নের অনেক কটা প্রকল্প নিয়ে শিলচরে আসেন। এজন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আমাদের অভিবাদন। এদিন ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’ নামকরণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে রাজ্য সরকার অনেক আগেই মান্যতা কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আজ কাগজে সেটি প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। কথাটা ঠিক। ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ এর সময় কালে এই মান্যতা পাঠানো হয় (Ref. No. NO PLA 4632008/432, Dated 10-02-2016)। কিছুদিন পর রাজ্যের নির্বাচনে ‘ভাজ পা’ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন। আগেই কেন্দ্রে ‘ভাজ পা’ সরকারের দায়ীত্বে আসেন। আমরা তিন জনের প্রতিনিধি রোজীব কর, রাজদীপ রায় এবং দীপায়ন চক্রবর্তী। *সেই সময়ে রাজদীপ রায় এবং দীপায়ন চক্রবর্তী সাংসদ, বিধায়ক হন নি।) রাজ্যের দেওয়া মান্যতাকে তরান্বিত সহ কেন্দ্রীয় সরকারের মান্যতা জোগাড় করতে দিল্লি ছুটে যাই।
গ্রাম, নগর, রেল স্টেশন ইত্যাদির নাম পরিবর্তন করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক হচ্ছে নোডাল অথরিটি। যদি সম্বন্ধযুক্ত রাজ্যের সরকার তা অনুমোদন করেন। এটাই ভারত সকারের প্রসিজিয়র। রাজনাথ সিং তখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমরা সংসদ ভবনের নর্থ ব্লকে সরাষ্ট্র দপ্তরে পৌঁছে দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে বিষয়টা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করি, বোঝাই বিষয়ের গুরুত্ব এবং অনুরোধ করি ভারত সরকার যেন দীর্ঘদিনের এই গণদাবীকে মান্যতা প্রদান করেন।

আনন্দের বিষয়, ২০১৬ সালের ৭ নভেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ভারত সরকারের মান্যতা আসাম সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেন। (Ref.44/72016-M&G/1496). সেখানে বলা হয় । am directed to refer to your Department’s letter No. PLA 463/2008/432 dated 10.02.2016 on the subject mentioned above and to say that the Government of India has No objection to change the name of “Silchar” Railway Station as “Bhasha Shahid Station Silchar” in the State of Assam.
A copy of the letter No.SM/23/05/2015 dated the 20″ October. 2016 received from the Ministry of Science & Technology intimating the spellings of the new name in Devnagri and Roman Script is enclosed. The State Government of Assam is requested to issue the required Gazette notification spelling the name accordingly in Devnagri (Hindi) and Roman (English) script and regional language. Copies of the said Notification may please be sent to the Office of the Survere General of India, Survey of India, Post Box No 37 Hathbarkaia Estate.
Dehradun- 248001 (Uttarakhand): The Director. Survey of India Tripura, Manipur and Mizoram Geo-Spatial Data Centre. N.S. Avenue, Rangirkhari Silchar- 788 005 (Assam), The Director. Northern Printing Group, Survey of India. Post Box No 28. Hathibarkala Estate. Dehradun- 248001 (Utarakhand: The Director Specialized Zone, Survey of india, Block 6. Hathicarkala Estate, Post Box No.200, Dehradun-248001 (Utaraknand); Ministy of Science & Technology.
Department of Scence and Technology. Subdivision, Technology Bhavan. New Mehrauli Road. New Delhi- 110 016, Department of Posts (Planning), Ministry of Communications, Dak Bhawan. Sansad Marg New Delhi-110 001: Ministry of Railways (Ralway Board) TG:V Section, Rail Bhavan. New Delhi-110 001 and to this Ministry for Information.’ এই চিঠির প্রতিলিপি আমাদের কাছেও পাঠানো হয়।
অর্থাৎ, ২০১৬ সালে “ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর” নিয়ে দুটো NOC. প্রথম তরুণ গগৈ সরকারের, দ্বিতীয় রাজনাথ সিং এর দপ্তর থেকে আসা। যেখানে রাজ্য সরকারকে নতুন বানানের বিষয়ে একটা গেজেট নোটিফিকেশন করতে বলা হয়েছে। আট বছর ধরে যা আজও ঝুলে আছে। এই সময়গুলোতে বিধানসভার বাইরে ভেতরে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীদের (প্রথমে শ্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এবং ড. হিমন্ত বিশ্বশর্মা) আমরা অসংখ্যবার মিলিত হয়েছি, কথা বলেছি, স্বারকলিপি দেয়েছি।

প্রতিবারই আমাদের মুখ্যমন্ত্রীরা ইতিবাচক কথা বলেছেন। গতকাল মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন, সেটা তরুন গগৈ সরকারের NOC নিয়ে। কিছুটা সত্য গোপন করেছেন। ভারত সরকারের কথামত নতুন নামের বানান নিয়ে গেজেট নোটিফিকেশন আজও অধরা! নামকরণ নিয়ে রাজ্য সাওকারের যা ছিলো একমাত্র কাজ।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ২০১৬ তে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়া একটা বিষয়ের ফাইলে দু বছর পর (৯ জুলাই ২০১৮) গুটি কয়েক ডিমাসা সম্প্রদায়ের খড়-কুটো একটা পালটা দাবীর কাগজ গুঁজে দেওয়ার অর্থ ১০০% অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অকারণে জলঘোলা করা। যা সকারের পাত্তা পাবারই কথা নয়। কাছার প্রশাসন এবং পুলিস প্রশাসনের এমন লিখিত বার্তা আসাম সরকারের আছে। সরকারের সেটা বোঝা উচিৎ।
উল্লেখ্য, বীর শম্ভুধন ফংলোর পূর্ণাবয়ব মূর্তি হাফলং বাজারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রোটারিতে স্থাপন করে ডিমা হাসাওয়ের জনগণ তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে চলেছে। তাঁর সংগ্রাম বা জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে কোনও রেলওয়ে স্টেশনেরই সংযোগ নেই। তাই কোনও স্টেশনেরই নাম তাঁর নামে নামাঙ্কিত করার প্রশ্ন ওঠে না। ডিমাসা রাজারা বৃহত্তর কাছড়ে এক সময়ে রাজত্ব করলেও তারা এ অঞ্চলের ভূমিপুত্র নন। ডিমাপুর থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রথমে মাইবাং এবং পরে কাছাড়ের (খাসপুর) আসেন।
ডিমাসা সম্প্রদায়ের দাবি মেনে উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলাকে ডিমা হাসাও নামকরণে সকল বাঙালিরই সমর্থন ছিল। গতকাল (২৫-১০-২০২৫) তাদেরই এক ভুঁইফোড় মুক্তেশ্বর কেন্দ্রাই সামাজিক মাধ্যমে গুচ্ছের আবোল তাবোল কথা সহ আমাদের প্রাণপ্রিয় শহিদদের বাংলাদেশী বলে গালাগাল করেছেন, যা চূরান্ত নিন্দনীয়। শিক্ষায় মারাত্মক শোচনীয় এই অসভ্যরা ভুলে গেছেন, আজও তাদের ভাষার কোনোও অক্ষর নেই বলে ইংলিশ বা বাংলাকেই সম্বল করতে হয়।
ডিমাসা সংস্কৃতি নিয়ে বাঙালিদের উপযাচক হয়ে উৎসাহ দেখানোর জন্যই হয়ত অস্তিত্বহীন এক সংগঠন এমন হৎকারিতা করার সাহস দেখাতে পেরেছে। শিলচর রেলস্টেশনের প্রবেশদ্বার, ডিসি অফিসের গেট এগুলি মাত্র বছর কয়েক আগে কোন্ যুক্তিতে মাইবাঙের ডিমাসা ভাস্কর্যের (এক পাথরের ঘর) আদলে বানানো হল! তখন প্রতিবাদ না করে আমরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ভাষিক ঐক্যের জয়ঘোষ গেয়ে তৃপ্তি পাই। কয়েক বছর পর পর “ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর” নিয়ে হঠাৎ এই ফাজলামোর যে কোনও বৈধতা নেই, তা রাজ্য সরকারের আধিকারিক ও মুখ্যমন্ত্রী ভালোই জানেন।
তাই রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার উপরই আটকে আছে এই নামকরণের বাস্তবায়ন। বাংলা ভাষার একাদশ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শিলচর রেলুয়ে স্টেশন বলেই এর নামকরণ “ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর” বাস্তবায়িত হোক।
আমরা আমাদের বিধায়ক, মন্ত্রী এবং সাংসদের আন্তরিক অনুরোধ, সত্যের সাথে থেকে আগামী নির্বাচনের দিন-ক্ষণ ঘোষনার আগে বরাকের মানুষের আত্মমর্যাদা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতিক, “ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর” এর উল্লেখিত গেজেট নোটিফিকেশন করাবার উদ্যোগ নিন। বরাকের মানুষের ভালোবাসা তাহলে কমবে না।


