নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মৃত্যুর তদন্ত, আটক নেতাদের আইনি অধিকার ও ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন; রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের বিরুদ্ধে ‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ নয়াদিল্লির
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
রাষ্ট্রপুঞ্জ: পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের পদক্ষেপের রিপোর্ট কবে প্রকাশ করা হবে, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের কাছে সেই প্রশ্ন তুলল ভারত। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মৃত্যুর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আটক নেতাদের আইনি সহায়তা এবং গোটা অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর মতো বিষয়গুলিতে পাকিস্তান কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরকে (ওএইচসিএইচআর) রিপোর্ট প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বুধবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের তৃতীয় কমিটিতে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনায় ভারতের বক্তব্য পেশ করেন রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুজ স্বরূপ। সেখানেই তিনি পিওকে-র পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের আগের বিবৃতি উল্লেখ করে পাকিস্তানের পদক্ষেপের বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে প্রশ্ন তোলেন।
স্বরূপ জানান, পিওকে-তে নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর হাতে মৃত্যুর অভিযোগের দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতর। যৌথ আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির আটক নেতাদের আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে বিচার এবং ইন্টারনেট পরিষেবার উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ও অসন্তোষের নিষ্পত্তিতে অর্থবহ রাজনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিল দফতর।
স্বরূপের প্রশ্ন, “এই বিষয়ে পাকিস্তান সরকার কী পদক্ষেপ করেছে, তা নিয়ে ওএইচসিএইচআর-এর রিপোর্ট কবে প্রকাশিত হবে?” তাঁর বক্তব্য, পাকিস্তানের উচিত নিজেদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকেও নজর দেওয়া। খাইবার পাখতুনখোয়া এবং রাওয়ালাকোটের মতো এলাকার পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বিরুদ্ধে বেছে বেছে প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ভারত। স্বরূপের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দফতরের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ‘অত্যন্ত বেছে নেওয়া’ বলে মনে হয়। তাঁর দাবি, প্রতিবেশী দেশ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভের সময় হিংসাত্মক দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠলেও সেগুলির ক্ষেত্রে সমানভাবে সরব হতে দেখা যায়নি রাষ্ট্রপুঞ্জকে।
ভারতের বক্তব্য, মানবাধিকার প্রশ্নে এই ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে। তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের তরফে এই নির্দিষ্ট অভিযোগের জবাব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
চলতি বছরের জুলাইয়ে পিওকে-তে আঞ্চলিক নির্বাচনকে ঘিরে অশান্তির মধ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন। জুন থেকে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য-সহ বহু মানুষের মৃত্যুর খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সব মৃত্যুর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
দিল্লির বিক্ষোভ নিয়ে আগের সংঘাত
ভারত ও রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের মধ্যে এই চাপানউতোরের সূত্র রয়েছে দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভ নিয়েও। গত সপ্তাহে রাজধানীতে বড় বিক্ষোভের আগে ও চলাকালীন বিক্ষোভকারী, আন্দোলনের নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের গণহারে আটক করার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ওএইচসিএইচআর।
তার জবাবে ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের মন্তব্যকে ‘অযাচিত’ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছিল। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সংবিধান-স্বীকৃত এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যম নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাষ্ট্রপুঞ্জে স্বরূপ বলেন, মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অহিংসা ও সমতার আদর্শ দেশের সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর দাবি, ভারতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলি আইন মেনেই কাজ করে এবং অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য আদালতের দ্বার খোলা রয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে এই কূটনৈতিক বিতর্কে ভারতের মূল দাবি, রাষ্ট্রপুঞ্জের সংশ্লিষ্ট দফতরকে সব দেশ ও অঞ্চলের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করতে হবে। পিওকে-তে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের পদক্ষেপের রিপোর্ট প্রকাশের প্রশ্নে এখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের অবস্থানের দিকেই নজর থাকবে।


