নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে বিক্ষোভ শুধু একজন প্রাক্তন শাসকের প্রতি ক্ষোভ নয়, অন্তর্বর্তী শাসনের সাফল্য, ব্যর্থতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে ওঠা অস্বস্তিকর প্রশ্নেরও প্রতিফলন
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
একটি দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সেই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের। আর সেই প্রশ্ন যদি বিদেশের মাটিতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো জনসমক্ষে উঠে আসে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত অসন্তোষের বিষয় থাকে না—দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বৃহত্তর বিতর্কের জন্ম দেয়। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভ সেই তাৎপর্যেই গুরুত্বপূর্ণ।
‘আপনি গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন’—বিক্ষোভকারীদের এই অভিযোগকে নিছক উত্তেজিত জনতার চিৎকার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই তা মেনে নেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনই রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে তাকে অগ্রাহ্য করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। বরং এই ঘটনাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে প্রবেশ করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন, প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সময় তাঁর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা।
এই দায়িত্বের সঙ্গে প্রত্যাশাও ছিল বিপুল। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে তাঁর অবস্থান অনেকের কাছে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের বৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনার ক্ষেত্রে তাঁর সরকার কার্যকর ভূমিকা নেবে। কিন্তু কোনও ব্যক্তির আন্তর্জাতিক খ্যাতি বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পরিচিতি নিজে থেকেই সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য নির্ধারিত হয় বাস্তব কাজ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে।
এখানেই ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক হিংসা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলি যথাযথ তদন্ত ও তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন। কোনও অভিযোগই শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সত্য হয়ে যায় না; আবার অভিযোগ উঠেছে বলে তাকে অস্বীকার করাও চলে না। সরকারকে তার কাজের হিসাব দিতে হয়, বিশেষ করে যখন সেই সরকার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
গণতন্ত্র কেবল একটি নির্বাচনের আয়োজন নয়। গণতন্ত্রের অর্থ আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচিত সরকারের পতনের পর গঠিত কোনও অন্তর্বর্তী প্রশাসনও এই নীতিগুলির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। বরং তার দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ তার বৈধতার প্রধান ভিত্তি থাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার অঙ্গীকার।
তবে নিউইয়র্কের বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আর একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসে—রাজনৈতিক প্রতিবাদের সীমা কোথায়? কোনও নেতার নীতি বা শাসনের সমালোচনা করা নাগরিকের অধিকার। বিদেশের মাটিতেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রতিবাদ যদি ব্যক্তিগত হেনস্থা, ভয় দেখানো কিংবা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পর্যায়ে পৌঁছয়, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মর্যাদা হারায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা।
কোনও নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। বিমানবন্দরের ভিডিয়োয় বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য শোনা গেলেও তাঁদের প্রত্যেকের পরিচয়, রাজনৈতিক যোগসূত্র কিংবা অভিযোগের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দাবি বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য—কোনওটিকেই প্রমাণের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত তথ্য, তদন্ত ও আইনের ভিত্তিতে; জনতার স্লোগান বা রাজনৈতিক প্রচারের ভিত্তিতে নয়।
এখানে ইউনূসের নিজের দায়িত্বও কম নয়। তাঁর সরকার যদি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, তবে সেই প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি সম্পর্কে জনসমক্ষে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক হিংসা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে তার তদন্তের ফল কী, দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়ে এই জবাবদিহির প্রয়োজন এড়ানো যায় না।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির কাছেও প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিনের মেরুকরণ, প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করেছে—এমন সমালোচনা বহুবার সামনে এসেছে। কোনও একটি সরকারের পতন মানেই সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন যদি কেবল প্রতিপক্ষের জায়গায় নতুন পক্ষকে বসায়, অথচ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আচরণের মৌলিক সমস্যাগুলি অমীমাংসিত থেকে যায়, তবে গণতন্ত্রের পুনর্গঠন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটি কতটা দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিশোধের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কতটা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং কতটা কার্যকরভাবে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে পারে তার উপর। রাজনৈতিক মতভেদকে রাষ্ট্রের শত্রুতা হিসেবে দেখা হলে গণতন্ত্রের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়। আবার ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাচ্যুত—কোনও পক্ষকেই জবাবদিহির বাইরে রাখা হলে আইনের শাসনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভ তাই একটি বৃহত্তর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সেই সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে বিক্ষোভকারীদের প্রতিটি অভিযোগ সত্য, কিংবা ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকার চূড়ান্ত মূল্যায়ন এই একটি ঘটনা থেকেই করা সম্ভব। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের নামে দায়িত্ব নেওয়া নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত কাজের ভিত্তিতেই বিচার করা হয়। প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক সম্মান বা ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি কোনওটাই জবাবদিহির বিকল্প নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতকে নতুন প্রতিহিংসায় পরিণত হতে না দেওয়া। গণতন্ত্র পুনর্গঠনের দাবি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তা শুধু বক্তৃতা বা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং আইনের সমান প্রয়োগে প্রতিফলিত হবে। গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয় ক্ষমতার পরিবর্তনের মুহূর্তে নয়, বরং সেই পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র কতটা ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠতে পারে, তার মধ্য দিয়ে।
ইউনূসকে ঘিরে নিউইয়র্কের বিক্ষোভের চূড়ান্ত রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়—গণতন্ত্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনও সরকারের একক কৃতিত্বও নয়। এটি জনগণের অধিকার, আর সেই অধিকার রক্ষার দায় প্রত্যেক শাসকের। যে নেতৃত্ব এই সত্য ভুলে যায়, তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তেই হয়।


