ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ শাক: লোকাচারের আড়ালে পুষ্টি ও সুস্থতার বার্তা

3 - মিনিট |

দীপাবলির আগে চোদ্দ শাক খাওয়া ও চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন রীতি। আয়ুর্বেদেও রয়েছে এই শাকগুলির উল্লেখ। জেনে নিন কোন শাকের কী গুণাগুণ।

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

দীপাবলির আগের দিন ভূত চতুর্দশী। বাংলার ঘরে ঘরে এই দিন চোদ্দ শাক খাওয়া এবং চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন রীতি প্রচলিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার পাশাপাশি পরিবারের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনার প্রতীক। তবে এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস ও ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরের যত্ন নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও।

চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা, অষ্টাঙ্গ হৃদয় ও ভাবপ্রকাশের মতো আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে বিভিন্ন শাকের ঔষধি ও পুষ্টিগুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীর পণ্ডিত রঘুনন্দন তাঁর ‘কৃত্যতত্ত্ব’ গ্রন্থে প্রাচীন স্মৃতিশাস্ত্র ‘নির্ণয়ামৃত’-এর মত অনুসরণ করে চোদ্দ শাক খাওয়ার বিধির উল্লেখ করেছেন।

ভূত চতুর্দশীর এই চোদ্দ শাকের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের ভেষজ ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। দেখে নেওয়া যাক, কোন শাকের কী বৈশিষ্ট্য।

১. ওল: ওলের কন্দ বহুদিন ধরেই আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যগতভাবে অর্শ, জন্ডিস ও রক্ত আমাশার মতো সমস্যায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। তবে সঠিকভাবে রান্না করে খাওয়াই জরুরি।

২. কেঁউ: কেঁউ পাতার রস আয়ুর্বেদে হজমকারক ও ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে পরিচিত। লোকজ চিকিৎসায় জ্বর, আমাশা, ডায়েরিয়া, কফ, ক্ষত, চর্মরোগ, চুলকানি ও বাতের সমস্যায় এই পাতার ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

৩. বেতো বা বেথুয়া: পুষ্টিগুণের দিক থেকে এই শাক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে ভিটামিন এ ও সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও জিঙ্ক রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডও পাওয়া যায়। হজমের সমস্যা, রক্তাল্পতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে এই শাক উপকারী হতে পারে।

৪. কালকাসুন্দে: কালকাসুন্দের পাতা লোকজ ও আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অ্যালার্জি, জ্বর, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ক্ষত নিরাময়ে পাতার রস ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

৫. সরিষা শাক: শীতকালীন খাদ্যতালিকায় সরিষা শাকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভিটামিন কে, সি ও ই-এর পাশাপাশি এতে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন পাওয়া যায়। হাড়ের স্বাস্থ্য এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধী কার্যক্রমে এই পুষ্টি উপাদানগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

৬. নিমপাতা: নিমের ঔষধি গুণের কথা আয়ুর্বেদে বহুদিন ধরেই আলোচিত। নিমপাতা ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন চর্মরোগ ও ত্বকের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে ডায়াবেটিসসহ কোনও রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিমপাতার উপর নির্ভর করা উচিত নয়।

৭. জয়ন্তী: জয়ন্তী একটি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। আয়ুর্বেদীয় ও লোকজ চিকিৎসায় বহুমূত্র, শ্বেতী এবং কৃমির সমস্যায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

৮. শালিঞ্চ বা শিঞ্চে: সাঁচি শাক নামেও পরিচিত এই শাক লোকজ খাদ্যসংস্কৃতির একটি অংশ। এতে থাকা পুষ্টি উপাদান চোখ, ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। হজমের সমস্যা ও ডায়েরিয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে এর ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। স্তন্যদানকারী মায়েদের দুধের পরিমাণ বাড়াতেও লোকজ চিকিৎসায় এই শাক ব্যবহারের কথা বলা হয়।

৯. গুড়ুচি বা গুলঞ্চ: আয়ুর্বেদে গুলঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। জ্বর, বাত, হজমের সমস্যা এবং লিভার সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দাবিও প্রচলিত। তবে গুলঞ্চের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন; বিশেষত লিভারের সমস্যায় এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে।

১০. পটলপাতা: পটলের পাতাও চোদ্দ শাকের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। আয়ুর্বেদীয় ও লোকজ চিকিৎসায় একে রক্তশোধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় পটলপাতার ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। ক্ষতস্থানে পাতার রস লাগানোর রীতিও রয়েছে।

১১. শেলুকা বা শুলফা: শুলফা গাছের পাতা ও কচি ডগা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। এর বীজ ও অন্যান্য অংশ রান্নায় মশলা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। হজমের সমস্যা, শিশুদের পেটের অসুবিধা এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যায় ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও এই শাকের প্রচলিত ব্যবহার রয়েছে।

১২. হেলেঞ্চা বা হিঞ্চে: হেলেঞ্চা শাক বাঙালির পরিচিত খাদ্যতালিকার অন্যতম উপাদান। এতে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট উপাদান রয়েছে। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় একে রক্তশোধক, পিত্তনাশক ও ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে এর উপকারিতার কথাও প্রচলিত রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

১৩. ঘেঁটু বা ঘণ্টাকর্ণ: ঘেঁটু পাতায় ফ্ল্যাভোনয়েড-সহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান পাওয়া যায়। লোকজ চিকিৎসায় চুল পড়া, কাশি, হাঁপানি, জ্বর, বাত ও চর্মরোগের সমস্যায় এই পাতার ব্যবহার রয়েছে। ক্ষত বা ফোলা জায়গায় পাতার প্রলেপ দেওয়ার প্রচলনও রয়েছে।

১৪. শুষনি: শুষনি একটি পরিচিত জলজ শাক। এর বৈজ্ঞানিক পরিচয় মার্সিলিয়া প্রজাতির অন্তর্গত। ভারত-সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি খাদ্য ও ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুষনি শাকে থাকা পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য উপকারী। লোকজ চিকিৎসায় অনিদ্রা, মাথাব্যথা, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, বাত ও ত্বকের সমস্যায় এর ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

লোকাচারের সঙ্গে পুষ্টির যোগ

ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনেরও পরিচয় বহন করে। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে স্থানীয়ভাবে পাওয়া বিভিন্ন শাক খাদ্যতালিকায় রাখার মধ্যে পুষ্টির বৈচিত্র্য আনার একটি দিক রয়েছে। বিভিন্ন শাকে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।

তবে আয়ুর্বেদ বা লোকজ চিকিৎসায় কোনও শাকের ঔষধি ব্যবহারের উল্লেখ থাকলেই তা নির্দিষ্ট রোগ সারাতে কার্যকর, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষত গর্ভবতী মহিলা, শিশু, স্তন্যদানকারী মা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভেষজ উপাদান ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ শাকের ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও সুস্থতার সম্পর্ক কতটা গভীর। তাই এই বিশেষ দিনে চোদ্দ শাকের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলার এই প্রাচীন খাদ্যঐতিহ্যকেও বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *