শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তি কেন্দ্রের; আটক বিক্ষোভকারীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতর
নয়াদিল্লিঃদিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের উদ্বেগ খারিজ করল ভারত। রাষ্ট্রপুঞ্জের মন্তব্যকে ‘অযৌক্তিক’ বলে দাবি করে কেন্দ্র জানিয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ’। শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার দেশের সংবিধানেই সুরক্ষিত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মুক্ত সংবাদমাধ্যম সেই অধিকার রক্ষায় সক্রিয় বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
রবিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে ভারত জানায়, অন্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো এ দেশেও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলি আইন মেনেই কাজ করে এবং কোনও অভিযোগের প্রতিকার চাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারও খোলা রয়েছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর বা ওএইচসিএইচআর-এর উদ্বেগের জবাবে ভারতের বক্তব্য, এ ধরনের মন্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপের শামিল।
‘দ্বিচারিতা রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে’
দিল্লির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বিশ্বের অন্যত্র বড় বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপুঞ্জ একই রকম গুরুত্ব দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে ভারত।
কেন্দ্রের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার দফতরের এমন দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা—দু’টিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এর এক দিন আগে, শনিবার রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র থামিন আল-খিতান দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে ও চলাকালীন প্রতিবাদী, আন্দোলনের নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের ব্যাপক হারে আটক করার খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার পুরোপুরি সম্মান করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। যাঁদের খামখেয়ালিভাবে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের অবিলম্বে এবং নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতর। পাশাপাশি, বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের সমাধানে অর্থবহ আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে ধরপাকড়
শনিবার দিল্লিতে ককোরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি সংগঠনের ডাকা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
দিল্লি পুলিশের অভিযানে রাজধানীর একাধিক জায়গা থেকে প্রায় ৭,০০০ মানুষকে আটক করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধী দলের নেতা এবং বিক্ষোভের আয়োজক সিজেপির সদস্যরাও ছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরে পৌঁছনো আটকাতে বিভিন্ন এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মেট্রো পরিষেবাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এই ধরপাকড় এবং পরিবহণে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টও বিষয়টি নিয়ে শুনানি করেছে।
দিল্লির ঘটনা নিয়ে এখন একদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার দফতরের উদ্বেগ, অন্যদিকে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও আইনশৃঙ্খলার যুক্তি—দুই অবস্থান মুখোমুখি। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।


