মিজোরামে ব্যাঙ্কার্স কনক্লেভে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বার্তা, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে ব্যাঙ্কগুলিকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান; মিজোরামে ঋণ-আমানত অনুপাত ৬৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা লালদুহোমার
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
আইজল: উত্তর-পূর্ব ভারতের আট রাজ্যের অর্থনীতি, শিল্পের সম্ভাবনা এবং স্থানীয় চাহিদা এক নয়। তাই গোটা অঞ্চলের জন্য একই ধরনের ঋণনীতি কার্যকর হবে না। ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বুঝে ঋণ দেওয়ার কৌশল তৈরি করতে হবে। মঙ্গলবার মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত তৃতীয় নর্থ-ইস্ট ব্যাঙ্কার্স কনক্লেভে এই বার্তাই দিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।
উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রক এবং নর্থ ইস্টার্ন ডেভেলপমেন্ট ফিনান্স কর্পোরেশন (নেডফি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে সিন্ধিয়া বলেন, আগরতলায় আগের সম্মেলন থেকে স্পষ্ট হয়েছিল যে উত্তর-পূর্বের জন্য একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি আর্থিক প্যাকেজ কার্যকর হবে না। আগের সম্মেলনে পরিকাঠামোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ বার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, যাঁদের ঋণের প্রয়োজন তাঁদের কাছে কীভাবে সেই ঋণ পৌঁছে দেওয়া যায়।
সিন্ধিয়ার কথায়, বার্ষিক এই সম্মেলন যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং উন্নয়নের অগ্রগতি যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে।
৪.৩ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, রাইজিং নর্থইস্ট সামিটে প্রায় ৪.৩ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছিল। তাঁর মন্ত্রকের পরবর্তী উদ্যোগের ফলে এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এই বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে পরিণত করতে ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান সিন্ধিয়া। তাঁর বক্তব্য, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কার্যকর করতে পর্যাপ্ত মূলধন, উপযুক্ত ঋণপণ্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের পর মুখ্যমন্ত্রীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্ক ফোর্সগুলি উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করেছে বলেও জানান তিনি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডরের দায়িত্বে থাকা মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা একটি সমন্বিত বহুমাধ্যম পরিবহণ করিডর, বিমান পরিবহণের কেন্দ্র এবং উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন পর্যটনস্থলকে যুক্ত করে সার্কিট তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্যভিত্তিক ঋণ পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত অর্থের জোগান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন সিন্ধিয়া।
২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ঋণ-আমানত অনুপাত ৬৭ শতাংশ করার লক্ষ্য
সম্মেলনে মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা ব্যাঙ্কগুলিকে আরও সক্রিয়ভাবে ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর লক্ষ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্যের ৫৫.৮৩ শতাংশ ঋণ-আমানত অনুপাতকে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে অন্তত ৬৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
লালদুহোমা জানান, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রাজ্যের সাতটি ব্যাঙ্কের ঋণ-আমানত অনুপাত ৪০ শতাংশের নীচে ছিল। শুধু আইজলকে কেন্দ্র করে নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করার উপর জোর দেন তিনি।
কৃষি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ঋণ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দুর্বল থাকার পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রেও (এমএসএমই) অবনতির বিষয়টি তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
পর্যটন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াকরণ, বাঁশশিল্প, তাঁত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে ঋণদানের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
লালদুহোমার বক্তব্য, মিজোরামে সম্ভাবনা রয়েছে এবং স্থানীয় উদ্যোগপতিরাও ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানের ঘাটতি পূরণ করাই ব্যাঙ্কগুলির প্রধান দায়িত্ব।
উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সংযোগ
এর আগে সোমবার মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া এবং ‘অষ্টলক্ষ্মী দর্শন ফেজ-২’ কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলেন সিন্ধিয়া। প্রচলিত পেশার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবন ও সমস্যার সমাধানে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে মিজো সংস্কৃতির মূল্যবোধ, বিশেষ করে ‘ত্লাওমঙাইহনা’ বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এই ধারণার সঙ্গে নিঃস্বার্থতা, সাহস, আতিথেয়তা, সেবা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ জড়িত।
সোমবার মিজোরামে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পও ঘোষণা করেন সিন্ধিয়া। তুইভামিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য আইজল ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড মিউজিকের উদ্বোধন করেন তিনি। পাশাপাশি আরও ন’টি প্রকল্পের শিলান্যাস করেন ভার্চুয়াল মাধ্যমে।
ব্যাঙ্কার্স কনক্লেভে আলোচনার মূল লক্ষ্য, উত্তর-পূর্বের বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়া। তবে তার জন্য শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়—স্থানীয় উদ্যোগ, জেলার চাহিদা এবং রাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ঋণনীতির সামঞ্জস্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


