মাশুলের আশঙ্কায় কি বদলাচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্টের অভ্যাস? সমীক্ষার দাবির সত্যতা যাচাই নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
একটা সময় ছিল, পকেটে নগদ টাকা না থাকলেও বিশেষ চিন্তা ছিল না। দোকানের কাউন্টার, রাস্তার পাশের চায়ের দোকান, রেস্তরাঁ কিংবা অনলাইন কেনাকাটা—সামনে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলেই কয়েক সেকেন্ডে মিটে যেত বিল। ইউপিআই ধীরে ধীরে শুধু একটি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়, দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
এখন সেই অভ্যাস নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
একটি সমীক্ষাকে উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, ভারতের প্রায় ৭৬ শতাংশ ইউপিআই ব্যবহারকারীর আগ্রহ কমেছে। তাঁদের একাংশ নাকি ফের কার্ড, ব্যাংক ট্রান্সফার কিংবা নগদ লেনদেনের দিকে ঝুঁকছেন। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে ইউপিআই লেনদেনে মাশুল বা অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনাকেও।
তবে এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—সমীক্ষাটি কার, কতজনের উপর করা হয়েছে এবং কোন সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে?
কারণ, ইউপিআই ব্যবহারকারীদের আচরণ নিয়ে ৭৬ শতাংশের মতো বড় একটি সংখ্যা সামনে এলে তার উৎস ও পদ্ধতি যাচাই না করে সেটিকে জাতীয় প্রবণতা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ইউপিআইয়ের সাফল্যের জায়গাটাই কি বদলে যাচ্ছে?
ইউপিআই জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সরলতা। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি টাকা পাঠানো, নগদ বহনের প্রয়োজন না থাকা এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেনদেন সম্পূর্ণ হওয়া—এই সুবিধাগুলিই সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবস্থাটিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
ছোট অঙ্কের লেনদেনেও ইউপিআই দ্রুত জায়গা করে নেয়। চায়ের দাম থেকে বাজারের কেনাকাটা, ট্যাক্সিভাড়া থেকে রেস্তরাঁর বিল—সব ক্ষেত্রেই কিউআর কোড হয়ে ওঠে পরিচিত দৃশ্য।
কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে খরচের প্রশ্নটি সামনে এলে ছবিটা বদলাতে পারে। ব্যবহারকারীর কাছে লেনদেনের পদ্ধতি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধার পাশাপাশি খরচও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সেই কারণেই মাশুল নিয়ে কোনও পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু বড় অঙ্কের লেনদেনে নয়, ছোট ছোট দৈনন্দিন পেমেন্টেও পড়তে পারে।
কার্ড ও নগদের দিকে কি সত্যিই ফিরছেন ব্যবহারকারীরা?
সমীক্ষার দাবিতে বলা হচ্ছে, ইউপিআই নিয়ে অনাগ্রহ তৈরি হওয়া ব্যবহারকারীদের একাংশ বিকল্প পদ্ধতির দিকে ফিরছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড, ব্যাংক ট্রান্সফার এবং নগদ লেনদেন।
তবে ‘ফিরে যাচ্ছেন’ কথাটিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
কারণ কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহারকারীর পছন্দ বদলানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট থেকে সরে যাওয়া—দুটি এক জিনিস নয়। একটি সমীক্ষায় সাময়িক আচরণগত পরিবর্তন ধরা পড়লেও তা থেকে দেশের সামগ্রিক পেমেন্ট ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না।
বিশেষ করে ইউপিআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে সময়কাল, নমুনার আকার, ব্যবহারকারীদের বয়স ও আর্থিক অবস্থান এবং কোন ধরনের লেনদেনকে সমীক্ষায় ধরা হয়েছে—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট ব্যবসায়ীরাও নজরে
ইউপিআইয়ের বিস্তার সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়েছে ছোট ব্যবসায়। রাস্তার পাশের দোকান, স্থানীয় বাজার, অটো-ট্যাক্সি, রেস্তরাঁ কিংবা ছোট পরিষেবা কেন্দ্র—অনেক ক্ষেত্রেই নগদের পাশাপাশি কিউআর কোড এখন নিয়মিত লেনদেনের মাধ্যম।
ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের খরচে বড় কোনও পরিবর্তন হলে তার প্রভাব ব্যবসায়ীদের উপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনের খরচ, নিষ্পত্তির সময় এবং পেমেন্ট গ্রহণের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানেও একই প্রশ্ন—বাস্তবে কতজন ব্যবসায়ী ইউপিআই থেকে সরে যাচ্ছেন, আর কতজন বিকল্প পদ্ধতিকে কেবল অতিরিক্ত একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন?
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
৭৬ শতাংশের দাবির আগে যে প্রশ্নগুলি জরুরি
ইউপিআই নিয়ে ৭৬ শতাংশ ব্যবহারকারীর অনাগ্রহের দাবি নিঃসন্দেহে নজর কাড়ার মতো। কিন্তু কোনও সমীক্ষার ফলাফলকে জাতীয় প্রবণতা হিসেবে তুলে ধরার আগে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সমীক্ষাটি কোন সংস্থা করেছে? কতজন ব্যবহারকারীর মতামত নেওয়া হয়েছে? কোন রাজ্য বা শহরের মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন? সমীক্ষার সময়কাল কী? ‘আগ্রহ কমেছে’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? ব্যবহার কমেছে, নাকি ব্যবহারকারীরা কেবল অন্য পেমেন্ট মাধ্যমও ব্যবহার করতে চাইছেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর না থাকলে ৭৬ শতাংশের পরিসংখ্যানটি সংবাদে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন।
ডিজিটাল পেমেন্টের সামনে বড় প্রশ্ন
ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারে ইউপিআইয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনকে সহজ করার পাশাপাশি এটি ছোট ব্যবসা এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়িয়েছে।
তাই ব্যবহারকারীদের আচরণে সত্যিই যদি বড় পরিবর্তন ঘটে থাকে, তার তাৎপর্য শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে ডিজিটাল লেনদেনের খরচ, গ্রাহকের সুবিধা এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য পেমেন্ট ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।
তবে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দাবি এবং প্রমাণকে আলাদা করে দেখা।
ইউপিআই ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশ আগ্রহ হারিয়েছেন—এই সংখ্যাটি যদি নির্ভরযোগ্য, বৃহৎ ও প্রতিনিধিত্বশীল সমীক্ষার ফল হয়, তাহলে তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। আর যদি সেটি সীমিত নমুনার কোনও সমীক্ষা হয়, তাহলে সেটিকে জাতীয় প্রবণতা হিসেবে দেখার আগে আরও তথ্যের প্রয়োজন।
কারণ ভারতের ডিজিটাল পেমেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে শুধু একটি শতাংশ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যবহারকারীর বাস্তব আচরণ, লেনদেনের পরিমাণ, ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা এবং মাশুল কাঠামোর পরিবর্তনের সমন্বিত ছবি।


