প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস, রেল যোগাযোগের প্রসার থেকে আদা চাষ—উত্তর-পূর্বের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কেন্দ্রের একাধিক উদ্যোগের কথা জানালেন ডোনার মন্ত্রী
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
আইজল:পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও দূরত্বের কারণে মিজোরামের মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে রাজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। সোমবার আইজলের উপকণ্ঠে তুইভামিতে এক অনুষ্ঠানে এই বার্তাই দিলেন কেন্দ্রীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া।
মিজোরামে দু’দিনের সফরে এসে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন তিনি। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও হস্তশিল্পের মতো একাধিক ক্ষেত্রের প্রকল্প রয়েছে এই তালিকায়।
সিন্ধিয়া বলেন, বাজার, হাসপাতাল এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে দূরত্ব উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এই বাধা কাটাতে কেন্দ্র ও মিজোরাম সরকার একসঙ্গে কাজ করছে। তাঁর কথায়, “ভূগোল আমাদের ভূদৃশ্যের রূপ নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করতে পারে না।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে সিন্ধিয়া বলেন, দেশের উন্নয়নে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যকে ‘অষ্টলক্ষ্মী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রেল যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা
মিজোরামের পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গে বৈরাবি-সাইরাং রেলপথের কথা তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর দাবি, ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের মাধ্যমে প্রথমবার দেশের রেল মানচিত্রে যুক্ত হয়েছে মিজোরাম। গত এক বছরে ১,১০০-র বেশি ট্রিপে প্রায় ১৫ লক্ষ যাত্রী এই পথে যাতায়াত করেছেন বলে জানান তিনি। এর ফলে আইজলের সঙ্গে গুয়াহাটি, কলকাতা ও দিল্লির যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে।
পণ্য পরিবহণেও এই রেলপথের গুরুত্ব বাড়ছে বলে দাবি সিন্ধিয়ার। পঞ্জাব থেকে ৪২টি ওয়াগন নিয়ে একটি মালগাড়িতে ২৬ হাজার কুইন্টাল চাল মিজোরামে পৌঁছনোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, উন্নত রেল যোগাযোগ রাজ্যে পণ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
আদা চাষে ২০০ কোটি টাকার মিশন
কৃষিক্ষেত্রে মিজোরামের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমার সঙ্গে কেন্দ্র ২০০ কোটি টাকার আদা মিশন নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান সিন্ধিয়া। তাঁর বক্তব্য, শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, চাষ থেকে প্রক্রিয়াকরণ, ব্র্যান্ডিং, পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনো পর্যন্ত একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
রাজ্যের পর্যটন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সিন্ধিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছ’মাসে মিজোরামে প্রায় ৫.৫ লক্ষ পর্যটক এসেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার বিদেশি পর্যটক। পর্যটন ও ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
৩৭৫টি প্রকল্পে প্রায় ৪,৭১০ কোটি টাকা
ডোনার মন্ত্রকের অধীনে মিজোরামে বর্তমানে প্রায় ৩৭৫টি প্রকল্প চলছে, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৪,৭১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৯৫টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলির সম্মিলিত মূল্য প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকা বলে জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
উন্নয়নের পাশাপাশি মিজোরামের নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার উপরও জোর দেন সিন্ধিয়া। তাঁর বক্তব্য, আধুনিক পরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কোনও বিরোধ নেই। বরং নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখেই রাজ্যকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোতে হবে।
মঙ্গলবার মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ব্যাঙ্কার্স কনক্লেভে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এই সম্মেলনে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উদ্যোগপতি ও ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানোই এই বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সিন্ধিয়া।


