জার্নাল অফ লস্ট স্পেসিস -এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মণিপুর বুশ র্যাটকে খুঁজে বের করতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক সমীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে।
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
উত্তরপূর্ব ভারতের জঙ্গলে এখনও বেঁচে থাকতে পারে এক বিরল ও অতি দুর্লভ ইঁদুর। কিন্তু বন্য পরিবেশে শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল ১৯৪৫ সালে। তারপর কেটে গিয়েছে ৭৬ বছর। মণিপুর বুশ র্যাট (হাড্রোমিস হুমেই) নামে পরিচিত এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটির অস্তিত্ব এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রজাতিটি আদৌ বিলুপ্ত হয়েছে কি না, তা জানতে অবিলম্বে পরিকল্পিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
জার্নাল অফ লস্ট স্পেসিস -এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মণিপুর বুশ র্যাটকে খুঁজে বের করতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক সমীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণীটির কোনও নিশ্চিত সন্ধান না মিললেও তাকে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও নেই। মণিপুর বুশ র্যাট উত্তরপূর্ব ভারতের স্থানীয় প্রজাতি এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আই ইউ সি এন) র তালিকায় এটি ‘বিপন্ন’ বা বিলুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত। গবেষণাটি করেছেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিফু ক্যাম্পাসের গবেষক সৌরভ গুপ্ত, অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ সায়েন্স অ্যান্ড বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. রামি এইচ. বেগম, আরণ্যকের টাইগার অ্যান্ড হারপেটোফনা রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন ডিভিশনের পরিচালক ও প্রধান ড. এম. ফিরোজ আহমেদ এবং জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানী ড. শ্যামকান্ত এস. তালমালে।
১৯৪৫এর পর আর কোনও নিশ্চিত সন্ধান নেই ১৮৮৬ সালে মণিপুরের মইরাং থেকে প্রথম এই প্রজাতির পরিচয় পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে মণিপুরের মইরাং ও ইম্ফল সংলগ্ন এলাকা এবং অসমের বর্তমান বাক্সা জেলার আঙ্গারাখাতায় এই প্রাণীর উপস্থিতির ঐতিহাসিক নথি পাওয়া যায়। তবে ১৯৪৫ সালের পর বন্য পরিবেশে মণিপুর বুশ র্যাটের কোনও নিশ্চিত উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। গবেষকদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণীটির দেখা না পাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে তার স্বভাব। এটি মূলত নিশাচর। অর্থাৎ রাতেই বেশি সক্রিয় থাকে। পাশাপাশি এটি মাটির নিচে গর্ত করে বসবাস করে। ফলে সাধারণ বন্যপ্রাণী সমীক্ষায় এই প্রাণীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তরপূর্ব ভারতে মণিপুর বুশ র্যাটকে খুঁজে বের করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক ক্ষেত্রসমীক্ষা হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। ফলে প্রাণীটি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছে, নাকি এখনও কোনও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকে রয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে মণিপুরের বিষ্ণুপুর ও সেনাপতি জেলা এবং অসমের বর্তমান বাক্সা জেলার আঙ্গারাখাতায় প্রথম পর্যায়ে অনুসন্ধান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। এর পাশাপাশি ভারতমায়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ভুটান সংলগ্ন পাদদেশীয় এলাকা ও মানস অঞ্চলেও একই ধরনের আবাসস্থলে সমীক্ষা চালানোর কথা বলা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরএই সময়টি মণিপুর বুশ র্যাটের সন্ধানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রাণীটির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জীবন্ত প্রাণী ধরার ফাঁদ, পিটফল ট্র্যাপ, ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং রাতে আলো ফেলে অনুসন্ধানের মতো একাধিক পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাটির নিচের গর্ত, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ এবং মল খুঁজে দেখার কথাও বলা হয়েছে। উচ্চতা নিয়ে নতুন রহস্য মণিপুর বুশ র্যাটকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে তার আবাসস্থলের উচ্চতা নিয়ে।
মণিপুরে ঐতিহাসিকভাবে এই প্রাণীর উপস্থিতি প্রায় ৯০০ থেকে ১,৩০০ মিটার উচ্চতায় নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে অসমের আঙ্গারাখাতায় পাওয়া ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, সেখানে প্রাণীটির অবস্থান ছিল মাত্র ১০০ থেকে ২০০ মিটার উচ্চতায়। দুই অঞ্চলের উচ্চতার এই বিপুল পার্থক্য গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। গবেষকদের একাংশের ধারণা, বর্তমানে র্যাট (হাড্রোমিস হুমেই)নামে চিহ্নিত প্রাণীটির মধ্যে একাধিক প্রজাতি থাকতে পারে। আবার এমনও হতে পারে যে মণিপুর বুশ র্যাটের বিস্তৃতি বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী ধারণার তুলনায় অনেক বেশি।
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন আধুনিক পদ্ধতিতে আরও জেনেটিক গবেষণারও প্রয়োজন । প্রাণীটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, জিনগত গঠন এবং বিবর্তনগত সম্পর্কএই তিনটি দিক একসঙ্গে বিবেচনা করে গবেষণা করা প্রয়োজন।বিশেষ করে হাড্রোমিস হুমেই কে নিয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট জেনেটিক গবেষণা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার পাশাপাশি জেনেটিক বিশ্লেষণ চালানো হলে বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া ঐতিহাসিক নমুনা একই প্রজাতির কি না, তা আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।সংরক্ষণেও গুরুত্ব (আইইউসিএন) এর তালিকায় বিলুপ্ত হিসেবে থাকা মণিপুর বুশ র্যাট ওয়াইল্ডলাইফ (প্রটেকশন) এমেন্ডমেন্ট এক্ট, 2022 এর অধীনেও সুরক্ষিত।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, ঐতিহাসিকভাবে যে এলাকাগুলিতে এই প্রাণীর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গিয়েছে, সেখানকার কোনও সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে এখনও এর উপস্থিতির নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, মণিপুর বুশ র্যাটকে পুনরায় খুঁজে পাওয়া শুধুমাত্র একটি বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করার ঘটনা হবে না। একই সঙ্গে এটি একটি বিরল বিবর্তনীয় ধারার এখনও টিকে থাকার প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান, আবাসস্থল নিয়ে পরিবেশগত গবেষণা, প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং জেনেটিক বিশ্লেষণসবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ৭৬ বছর ধরে নিখোঁজ মণিপুর বুশ র্যাট এখনও তাই এক রহস্য। বিলুপ্ত বলে নিশ্চিত নয়, আবার বেঁচে থাকারও প্রমাণ নেই। উত্তরপূর্ব ভারতের জঙ্গল ও তৃণভূমিতে একটি পরিকল্পিত অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত সেই রহস্যের উত্তর দিতে পারে।


