অভিযোগ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত; তদন্তের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশেরও দাবি মণিপুরের কংগ্রেস সাংসদের
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
ইম্ফল: জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ তুললেন ইনার মণিপুরের সাংসদ অ্যাঙ্গোমচা বিমল আকোইজাম। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাবি করে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার, ১২ অক্টোবর, ইম্ফলের কেইশামথংয়ে নিজের বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে আকোইজাম অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কমিটি এবং উপাচার্য নির্ধারিত নিয়মকানুন উপেক্ষা করে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছেন। তদন্তের দ্রুততা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আপত্তি জানানোর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে তদন্তের গোপন তথ্য প্রকাশ করে বিষয়টিকে কার্যত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এ পরিণত করা হয়েছে।
তদন্তের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন
আকোইজামের দাবি, ৯ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটে অভ্যন্তরীণ কমিটির কাছ থেকে তদন্ত শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে ই-মেল পান তিনি। তাঁর প্রশ্ন, এত অল্প সময়ের মধ্যে উপাচার্য কীভাবে তদন্তের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে বরখাস্তের নির্দেশ জারি করলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বিধি অনুসারে তদন্তের রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে দেওয়ার এবং আপত্তি জানানোর জন্য ৩০ দিনের সময় পাওয়ার কথা বলে দাবি করেছেন তিনি। বরখাস্তের আগে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাংসদ।
তাঁর আরও অভিযোগ, ৯ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তিনি তদন্তের রিপোর্টের প্রতিলিপি পান। অথচ তার আগেই সংবাদমাধ্যমে তাঁর বরখাস্তের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকার আইন, ২০১৩—যা ‘পোশ’ আইন নামে পরিচিত—তার ১৬ নম্বর ধারায় তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষার বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সেই বিধিও লঙ্ঘিত হয়েছে।
উপাচার্য তদন্ত চলাকালীন তাঁকে প্রায় ৩০০টি ই-মেল পাঠিয়েছিলেন বলে যে দাবি করেছেন, তা-ও খারিজ করেছেন আকোইজাম। তাঁর বক্তব্য, এই বিষয়ে তাঁর কাছে ৪৩টি ই-মেলের রেকর্ড রয়েছে। তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত যোগাযোগে উপাচার্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সহযোগিতা না করার অভিযোগ খারিজ
তদন্তে সহযোগিতা করেননি বলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আকোইজাম। তাঁর দাবি, ৩১ মে লিখিত জবাব জমা দিয়েছিলেন, ১৬ জুলাই কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে লিখিত বয়ানও দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে হয়রানি করার জন্য তদন্তপ্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
অভিযোগকারীদের সংখ্যা ও অভিযোগের প্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাংসদ। তাঁর দাবি, অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৫ জন রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে তিন জন পুরুষ। পুরুষ পড়ুয়াদের অভিযোগ পোশ আইনের আওতায় গ্রহণ করা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
নম্বর দেওয়ার বিনিময়ে যৌন সুবিধা চাওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে নথিভিত্তিক প্রমাণ প্রকাশের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন আকোইজাম। তাঁর বক্তব্য, তিনি যে নথিগুলি দেখেছেন, তাতে এই অভিযোগের উল্লেখ পাননি। তবে অভিযোগের প্রকৃতি ও তদন্তের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগ
বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে আকোইজাম বলেন, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থ তুলে ধরতেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন।
এই ঘটনার জেরে মণিপুরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের আস্থার সংকট গভীর হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না জানিয়ে সাংসদ বলেন, তাঁর প্রথম দায়িত্ব যাঁরা তাঁকে নির্বাচিত করেছেন, তাঁদের প্রতি।
আকোইজাম জানিয়েছেন, জেএনইউয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হবেন তিনি। তাঁর আশা, বিচারব্যবস্থা তাঁকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করে তিনি এই বিতর্কে হতাশাও প্রকাশ করেন।
মণিপুরে ফিরে নিজের মানুষের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর কথা ভাবছেন বলেও জানিয়েছেন সাংসদ। একই সঙ্গে রাজ্যের যুবসমাজকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ্যে আসবেই।
উল্লেখ্য, বরখাস্তের সিদ্ধান্ত, তদন্তপ্রক্রিয়া এবং যৌন হেনশার অভিযোগ নিয়ে আকোইজামের বক্তব্য তাঁর নিজের দাবি। এই অভিযোগগুলির সত্যতা বা তদন্তে বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আদালতে চ্যালেঞ্জের পর বিষয়টি কোন দিকে গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর।


