গুয়াহাটির পর অসমে দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র ডিব্রুগড়ে

2 - মিনিট |

উজান অসমের চা উৎপাদকদের জন্য নতুন ই-নিলাম প্ল্যাটফর্ম; প্রথম নিলামে উঠল ২.২৩ লক্ষ কেজির বেশি সিটিসি চা

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

ডিব্রুগড়: গুয়াহাটির পর অসমে দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল ডিব্রুগড়। উজান অসমের চা উৎপাদকদের বাজারের কাছাকাছি আনতে নতুন এই ই-নিলাম প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে অসম চা বাজার। শুক্রবার ডিব্রুগড়ের এইচ এম রিসর্টে প্রথম ই-নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।

নতুন কেন্দ্রটি বিশেষ করে ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, শিবসাগর এবং চরাইদেও জেলার চা উৎপাদকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এতদিন এই অঞ্চলের উৎপাদকদের তৈরি চা গুয়াহাটি বা কলকাতার নিলাম কেন্দ্রে পাঠাতে হত। ফলে পরিবহণ, প্যাকেজিং, হ্যান্ডলিং এবং অন্যান্য লজিস্টিক খরচ যুক্ত হত।

ডিব্রুগড়ে নিলাম কেন্দ্র চালু হওয়ায় উৎপাদন এলাকার কাছেই চা বিক্রির একটি সংগঠিত বাজার তৈরি হল। এর ফলে পরিবহণের খরচ ও সময়—দুই-ই কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

প্রথম নিলামে ১২৬ জন বিক্রেতা এবং ৫০টির বেশি ক্রেতা অংশ নেন। যদিও প্রথম দিনের নিলামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন ১৮ জন ক্রেতা। লিফ ও ডাস্ট—দুই বিভাগ মিলিয়ে মোট ২.২৩ লক্ষ কেজির বেশি সিটিসি চা নিলামে ওঠে।

সিটিসি লিফ বিভাগে ১৭৫টি লটে ৪,৪১৯ প্যাকেজে মোট ১,৪৮,৫৩১ কেজি চা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬১.৩৩ শতাংশ বিক্রি হয়। গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ২০৬ টাকা।

ডাস্ট বিভাগে ৮৩টি লটে ১,৯৬৮ প্যাকেজে ৭৪,৬৯৩.৫ কেজি চা নিলামে ওঠে। এর প্রায় ৬৩.১৬ শতাংশ বিক্রি হয়েছে। এই বিভাগে গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ২১০ টাকা।

দুই বিভাগ মিলিয়ে প্রথম নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের গড় দাম দাঁড়ায় কেজিপ্রতি প্রায় ২০৭ টাকা। দুপুর ১২টায় শুরু হওয়া নিলাম ও বিক্রির প্রক্রিয়া প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়।

অসম চা বাজারের প্রতিনিধি দেবেন সিং জানান, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার-সহ কয়েকটি বড় সংস্থা প্রথম নিলামে অংশ নিতে পারেনি।

ডিব্রুগড়ের নতুন নিলাম কেন্দ্রকে চা শিল্পে কার্যকর করে তুলতে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি বলে জানিয়েছেন চা পর্ষদের আধিকারিকরা।

১৮ জুলাই অসম চা বাজারকে নিলাম পরিচালনার লাইসেন্স দেয় চা পর্ষদ। প্রায় দুই মাসের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মটি প্রথম নিলাম শুরু করল।

চা পর্ষদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কার্যালয়ের কার্যনির্বাহী অধিকর্তা অরুণিতা ফুকন যাদব নতুন কেন্দ্রকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নিলামটি দেশের চা-বাজার সংক্রান্ত নিয়ম ও নির্দেশিকা মেনে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে আরও বেশি ক্রেতাকে প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উপর জোর দেন তিনি।

চা নিলামে ক্রেতার সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মান ও শ্রেণির চায়ের জন্য বেশি সংখ্যক ক্রেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে উৎপাদকরা আরও প্রতিযোগিতামূলক দাম পাওয়ার সুযোগ পান।

ডিব্রুগড়ে নিলাম কেন্দ্র চালু হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন ছোট চা উৎপাদকরা—এমনটাই মনে করছেন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

প্রবীণ চা-উৎপাদক মৃগেন্দ্র জালান বলেন, এতদিন কলকাতা বা গুয়াহাটিতে চা পাঠাতে উৎপাদকদের অতিরিক্ত খরচ হত। স্থানীয় নিলাম কেন্দ্র চালু হওয়ায় সেই ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাঁর মতে, নতুন নিলাম কেন্দ্রকে ঘিরে গুদাম, পরিবহণ এবং অন্যান্য সহায়ক পরিষেবার চাহিদাও বাড়তে পারে। এর ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে উৎপাদন কেন্দ্র থেকে নিলাম কেন্দ্র এবং সেখান থেকে ক্রেতার কাছে চা পৌঁছনোর পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা সময় ও খরচ কমানো যায় তার উপর।

ই-নিলাম ব্যবস্থার সাফল্যের জন্য প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম নিলামেই কয়েকটি বড় ক্রেতা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অংশ নিতে পারেনি। ভবিষ্যতে নিয়মিত ক্রেতা ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ দরপত্র ব্যবস্থা এবং দ্রুত লেনদেন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে।

নিলামের পরিমাণ বাড়লে পর্যাপ্ত গুদাম এবং অন্যান্য লজিস্টিক পরিকাঠামোর প্রয়োজনও বাড়বে।

অসম চা উৎপাদক সমিতির সভাপতি সমুদ্রপ্রসাদ বড়ুয়া এবং প্রাক্তন চা পর্ষদ চেয়ারম্যান প্রভাত বেজবরুয়ারাও ডিব্রুগড়ে নতুন নিলাম কেন্দ্র চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

উজান অসম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চা উৎপাদন অঞ্চল। সেই উৎপাদন এলাকার কাছেই সংগঠিত নিলাম ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় উৎপাদকদের বাজারে পৌঁছনোর দূরত্ব কমল।

তবে কেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত ও বৈচিত্র্যময় ক্রেতা অংশগ্রহণ, পর্যাপ্ত নিলামযোগ্য চায়ের পরিমাণ, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এবং গুদাম ও পরিবহণ ব্যবস্থার উপর।

প্রথম নিলামে ২.২৩ লক্ষ কেজির বেশি চা ওঠা এবং কেজিপ্রতি প্রায় ২০৭ টাকা গড় দাম পাওয়ার মধ্য দিয়ে ডিব্রুগড়ের নতুন নিলাম কেন্দ্র তার যাত্রা শুরু করল। আগামী দিনে এই প্ল্যাটফর্ম উজান অসমের চা উৎপাদকদের জন্য কতটা কার্যকর বাজার তৈরি করতে পারে, সেটাই এখন দেখার।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *