নতুন ব্যাকটেরিয়া ‘ব্রেভান্ডিমোনাস’ দিয়ে ডাইরেক্ট ব্লু-৬ ভাঙার সাফল্য; চিকিৎসার পর তৈরি পদার্থ বিষমুক্ত বলেও গবেষণায় দাবি
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
গুয়াহাটি: টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্যজলে থাকা বিষাক্ত কৃত্রিম রং দূর করতে নতুন জৈবিক পদ্ধতির সন্ধান পেল আইআইটি গুয়াহাটি। গবেষকরা এমন একটি নতুন ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছেন, যা বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম টেক্সটাইল রং ডাইরেক্ট ব্লু-৬-এর ৯৮.৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। শুধু রং অপসারণ নয়, ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভাঙনের পর তৈরি পদার্থও বিষাক্ত নয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, এই ফল গুরুত্বপূর্ণ কারণ শিল্পবর্জ্যের ক্ষেত্রে শুধু জলের রং চলে যাওয়া মানেই দূষণ সম্পূর্ণ দূর হওয়া নয়। রং ভেঙে যাওয়ার পর তৈরি কিছু রাসায়নিক পদার্থও ক্ষতিকর হতে পারে। সেই জায়গায় রং ভাঙার পাশাপাশি বিষাক্ততা কমানোর ক্ষমতা জৈবিক বর্জ্যশোধন পদ্ধতির সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গবেষণায় শনাক্ত ব্যাকটেরিয়াটির নাম ব্রেভান্ডিমোনাস স্পেসিস এজেডজেড-০৫। এটি স্থানীয় একটি টেক্সটাইল বর্জ্যজল নির্গমনস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়।
টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন কৃত্রিম রঙের মধ্যে অ্যাজো ডাই বিশেষ ভাবে স্থিতিশীল। এই রঙের অণুতে থাকা ‘অ্যাজো বন্ড’ তার উজ্জ্বল রং এবং রাসায়নিক স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাধারণ বর্জ্যশোধন ব্যবস্থায় এই ধরনের রং ভাঙা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
শিল্পবর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় জলাশয়ে গেলে শুধু জলের রং বদলায় না, জলে আলো প্রবেশের পরিমাণ কমে গিয়ে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বর্জ্যে থাকা স্থায়ী জৈব যৌগ ও তাদের ভাঙনজাত পদার্থ দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই আধুনিক বর্জ্যশোধন গবেষণার লক্ষ্য শুধু ‘ডিকালারাইজেশন’ বা রং তুলে দেওয়া নয়। লক্ষ্য হল রঙের অণুকে এমন ভাবে ভেঙে ফেলা, যাতে তার ক্ষতিকর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও কমে যায়।
আইআইটি গুয়াহাটির গবেষকরা স্থানীয় একটি টেক্সটাইল বর্জ্যজল নির্গমনস্থল থেকে ব্রেভান্ডিমোনাস স্পেসিস এজেডজেড-০৫ ব্যাকটেরিয়াটি আলাদা করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যাকটেরিয়াটি ডাইরেক্ট ব্লু-৬ ভাঙতে পারে।
এর অন্যতম কারণ হল ব্যাকটেরিয়ার তৈরি ‘অ্যাজোরিডাক্টেজ’ নামের এনজাইম। এই এনজাইম অ্যাজো বন্ডের উপর কাজ করে, যা ডাইয়ের অণুর গঠন ভাঙার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
গবেষকরা শুধু ব্যাকটেরিয়াটির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করেই থেমে থাকেননি। কোন পরিবেশে ব্যাকটেরিয়াটি সবচেয়ে কার্যকর ভাবে ডাই ভাঙতে পারে এবং কখন সর্বাধিক পরিমাণে এনজাইম তৈরি করে, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এর জন্য ‘রেসপন্স সারফেস মেথডোলজি’ নামে পরিসংখ্যানভিত্তিক বহু-লক্ষ্য অপ্টিমাইজেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একই সঙ্গে ডাই ভাঙার হার এবং অ্যাজোরিডাক্টেজ উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পরিস্থিতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণায় নির্ধারিত অনুকূল পরিস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়াটি ডাইরেক্ট ব্লু-৬-এর ৯৮.৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভাঙতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডাই ভাঙার পর তৈরি পদার্থগুলির বিষাক্ততা পরীক্ষা করা।
কারণ কোনও বর্জ্যজল থেকে রং দ্রুত চলে গেলেই সেটিকে নিরাপদ বলা যায় না। ডাইয়ের অণু আংশিক ভাবে ভেঙে এমন নতুন রাসায়নিক তৈরি হতে পারে, যেগুলিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
আইআইটি গুয়াহাটির গবেষণায় তাই ডাইরেক্ট ব্লু-৬ কতটা ভাঙল, তার পাশাপাশি ভাঙনের পরে তৈরি পদার্থের বিষাক্ততাও পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাকটেরিয়াল চিকিৎসার পর তৈরি পদার্থগুলি বিষাক্ত ছিল না।
এই ফলই গবেষণাটিকে শুধুমাত্র ‘রং সরানোর’ পরীক্ষা থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার লক্ষ্য ছিল ডাইয়ের অণুকে ভেঙে এমন পদার্থে পরিণত করা, যার ক্ষতিকর প্রভাব কম।
টেক্সটাইল শিল্পে বর্জ্যজল শোধনের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন ভৌত ও রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বর্জ্যজলের ধরন এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে এই প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট শক্তি ও রাসায়নিকের প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মূল দূষণ কমানোর বদলে দ্বিতীয় পর্যায়ের বর্জ্য বা দূষকও তৈরি হতে পারে।
জৈবিক শোধন পদ্ধতিতে অণুজীব বা তাদের তৈরি এনজাইম ব্যবহার করে জটিল দূষককে অপেক্ষাকৃত সরল পদার্থে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ফলে এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে প্রচলিত প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে নয়তো অন্তত তার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে আইআইটি গুয়াহাটির গবেষণার ফলকে সরাসরি শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য প্রযুক্তি হিসেবে দেখার আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। বর্তমান ফল নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক পরিবেশে পাওয়া হয়েছে। বাস্তব টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্যজলে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে তাপমাত্রা, পিএইচ, ডাইয়ের ঘনত্ব এবং অন্যান্য রাসায়নিকের উপস্থিতির মতো একাধিক বিষয়ের উপর।
বড় পরিসরে ব্যাকটেরিয়াটির স্থায়িত্ব, কার্যক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাও পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহারের খরচও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
টেক্সটাইল শিল্প কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর বর্জ্যজল পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন ধরনের ডাই ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এই বর্জ্যজলের রাসায়নিক গঠন জটিল হতে পারে।
জলাশয়ে রঙিন বর্জ্য ঢুকলে সূর্যের আলো জলে প্রবেশের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এর পাশাপাশি স্থায়ী রাসায়নিক যৌগ এবং তাদের ভাঙনজাত পদার্থ জলজ জীবের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে এমন একটি জৈবিক পদ্ধতি, যা একই সঙ্গে ডাই ভাঙতে এবং অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর পদার্থ তৈরি করতে সক্ষম, ভবিষ্যতের বর্জ্যশোধন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আইআইটি গুয়াহাটি এবং আইআইটি (বিএইচইউ), বারাণসীর গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক আইআইটি গুয়াহাটির অজিতকুমার ভেলুচামি, জোথিকা জেয়াবালান এবং ড. সেলভারাজু নারায়ণস্বামী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইআইটি (বিএইচইউ)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের ড. অঙ্কুর বর্মা।
গবেষণাটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের প্রধানমন্ত্রী রিসার্চ ফেলোশিপের সহায়তায় পরিচালিত হয়। অতিরিক্ত সহায়তা এসেছে আইআইটি (বিএইচইউ)-এর সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে।
গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে পিয়ার-রিভিউড জার্নাল এনভায়রনমেন্টাল জিওকেমিস্ট্রি অ্যান্ড হেলথ-এ।
আইআইটি গুয়াহাটির এই গবেষণা দেখাচ্ছে, টেক্সটাইল বর্জ্যজলের সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যতে অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তি আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। ডাইরেক্ট ব্লু-৬-এর ৯৮.৫০ শতাংশ ভাঙন এবং ভাঙনজাত পদার্থের বিষাক্ততা না থাকার রিপোর্ট সেই সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে।
তবে গবেষণাগার থেকে কারখানার বাস্তব পরিসরে পৌঁছনোটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাস্তব শিল্পবর্জ্যে একই কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং কম খরচে এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক বর্জ্যশোধন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হলে, টেক্সটাইল শিল্পের দূষণ নিয়ন্ত্রণে এটি একটি নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।


