যন্তর মন্তর আর প্রতিবাদের ঠিকানা নয়! বিক্ষোভ সরাতে দিল্লি পুলিশের নির্দেশ, ‘গোটা দেশই যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে’

3 - মিনিট |

বিকল্প প্রতিবাদস্থল রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি গ্রাউন্ড ও সিবিডি গ্রাউন্ড। সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরের কাছ থেকে বিক্ষোভ সরানোর সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের অভিযোগ বিরোধী ও নাগরিক সমাজের

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

নয়াদিল্লি: কয়েক দশকের প্রতিবাদ, আন্দোলন ও গণদাবির সাক্ষী যন্তর মন্তর। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে কুস্তিগিরদের প্রতিবাদ—বারবার দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে দিল্লির এই এলাকা। এবার সেই যন্তর মন্তরকেই নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিল দিল্লি পুলিশ। পরিবর্তে বিক্ষোভ ও জমায়েতের জন্য রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ডকে বিকল্প স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর জারি হওয়া এই নির্দেশ ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সংসদ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরের কাছ থেকে প্রতিবাদ সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে।

দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের স্বাক্ষরিত নির্দেশে বলা হয়েছে, নাগরিকদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আয়োজনের উপযুক্ত বিকল্প স্থান খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই যন্তর মন্তরকে নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্দেশে আরও জানানো হয়েছে, বিকল্প তিনটি স্থানে কীভাবে বিক্ষোভ আয়োজন করা যাবে, তা নিয়ে সংশোধিত নির্দেশিকা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) পরে প্রকাশ করা হবে। ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল জারি হওয়া পুলিশের আগের নির্দেশের কিছু অংশ সংশোধন করেই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।

তবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার কতটা সীমিত করা যায়? বিশেষ করে, যখন প্রতিবাদের লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকার, তখন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে বিক্ষোভ সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তাৎপর্য নিয়েই সরব হয়েছেন বিরোধী নেতারা।

‘এ বার বলবে দিল্লিতেই ঢোকা যাবে না’

কংগ্রেস সাংসদ চরণজিৎ সিং চান্নি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে প্রতিবাদের উপর আরও কড়াকড়ি চাপানো হতে পারে।

তাঁর কথায়, “কিছু দিন পর ওরা বলবে দিল্লিতে ঢোকা যাবে না, যেন দিল্লিটা বিজেপির।”

কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈয়ের অভিযোগ, জনবিরোধী প্রতিবাদের আশঙ্কা থেকেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “ওরা ভয় পেয়েছে। ওরা জানে, আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।”

আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণও সিদ্ধান্তটির বৈধতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কেবল নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল বেঁধে দিয়ে শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার খর্ব করা যায় না।

ভূষণের অভিযোগ, “সরকার স্পষ্টতই প্রতিবাদকে দিল্লির প্রান্তে ঠেলে দিতে চাইছে। বড় বিক্ষোভের জন্য রামলীলা ময়দানও ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্ত অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বেআইনি।” শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও প্রতিবাদকে মৌলিক অধিকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

‘আজ যন্তর মন্তর, কাল গণতন্ত্র?’

যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন অভিজিৎ দীপকেও। সমাজমাধ্যমে তিনি এই পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

এক্স-এ তিনি লেখেন, “আজ মোদি যন্তর মন্তরকে নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলের মর্যাদা থেকে সরালেন। কাল তিনি গণতন্ত্রকেই তালিকা থেকে সরিয়ে দেবেন। একনায়কের সমস্যা কখনও প্রতিবাদস্থল ছিল না। সমস্যা ছিল মানুষের প্রতিবাদ করার ধারণাটাই।”

ককরোচ জ়নতা পার্টির সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাসও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, যন্তর মন্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদস্থল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কি দেশের সাধারণ মানুষ, নাগরিক সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা করেছিল?

তাঁর কথায়, “যন্তর মন্তর ভারতের মানুষের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কি দেশের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছে? কোনও পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে? কোনও সংগঠনের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে?”

এই সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী বলে আখ্যা দিয়ে সৌরভের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও জমায়েতের মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত হেনেছে এই পদক্ষেপ।

তাঁর বক্তব্য, “আমরা এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত মানি না। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকারের উপর আঘাত। এ বার গোটা দেশই যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে!”

আন্না হাজারে থেকে কুস্তিগিরদের আন্দোলন—ইতিহাসের সাক্ষী যন্তর মন্তর

দিল্লিতে প্রতিবাদের ঠিকানা হিসেবে যন্তর মন্তরের উত্থানের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরনো। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ইন্ডিয়া গেটের কাছে বোট ক্লাব এলাকায় বিক্ষোভে বিধিনিষেধ আরোপের পর বিকল্প প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে।

এর আগে ১৯৮৮ সালে মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে বোট ক্লাব এলাকায় সপ্তাহব্যাপী কৃষক আন্দোলনে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যন্তর মন্তর হয়ে ওঠে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।

২০১১ সালে আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন যন্তর মন্তরকে জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। শক্তিশালী লোকপাল গঠনের দাবিতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। এরপর পেনশনভোগী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন নিজেদের দাবি তুলে ধরতে বারবার এই জায়গাকে বেছে নিয়েছে।

২০২৩ সালে ভারতীয় কুস্তিগিরদের আন্দোলনেরও অন্যতম কেন্দ্র ছিল যন্তর মন্তর। অলিম্পিক পদকজয়ী-সহ একাধিক কুস্তিগির তৎকালীন ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করেছিলেন।

তবে যন্তর মন্তরকে ঘিরে বিধিনিষেধের বিতর্কও নতুন নয়। শব্দদূষণ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগের পর ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত সেখানে বিক্ষোভে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই সার্বিক নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে উপযুক্ত নিয়ম মেনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অনুমতি দেয়।

প্রতিবাদের জায়গা সরলেই কি আড়াল হবে প্রতিবাদ?

দিল্লি পুলিশের নতুন নির্দেশ ঘিরে সমাজমাধ্যমেও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে বিক্ষোভ সরিয়ে দিলে আন্দোলনের দৃশ্যমানতা কমবে এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজেদের দাবি সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।

প্রশাসনের যুক্তি, প্রতিবাদের জন্য বিকল্প জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু বিরোধী ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের প্রশ্ন, প্রতিবাদ করার অনুমতি থাকলেই কি প্রতিবাদের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়? সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরের কাছাকাছি নিজেদের দাবি তুলে ধরার সুযোগও কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়?

যন্তর মন্তরের মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি প্রতিবাদস্থলের প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার, সরকারের জবাবদিহি এবং ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ। বিকল্প তিনটি স্থানে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হলেও, প্রতিবাদের কেন্দ্রকে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাজধানীতে গণতান্ত্রিক অসন্তোষ প্রকাশের জায়গা কি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *