উন্নয়নের রূপরেখা ও মণিপুর প্রসঙ্গে মুখ খুললেন বিধায়ক রাজদীপ রায়
বিশ্বদীপ গুপ্ত
ইম্ফল: শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায় বলেছেন, তাঁর প্রয়াত পিতা তথা বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা বিমলাংশু রায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকে তিনি একদিকে যেমন দায়িত্ব, তেমনি গর্বের বিষয় হিসেবেও দেখেন। তিনি বলেন, বারাক উপত্যকায় ভারতীয় জনতা পার্টির ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর পিতার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইম্ফলে KRC TIMES-এর প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বদীপ গুপ্ত পরিচালিত “It Matters” অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডাঃ রায় বারাক উপত্যকায় বিজেপির উত্থান, তাঁর পিতার প্রভাব, উপত্যকার উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বারাক উপত্যকায় বিজেপির উত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে দলের শিকড় বহু দশক আগেই স্থাপিত হয়েছিল এবং সেই ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর পিতা প্রয়াত বিমলাংশু রায় ও প্রয়াত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের মতো নেতারা।
তিনি বলেন, “এই অঞ্চলে বিজেপির উত্থান মূলত আমার পিতা ও কবীন্দ্র পুরকায়স্থের মতো নেতাদের ত্যাগ ও প্রচেষ্টার ফল। আমার পিতা এই অঞ্চলে বিজেপির বীজ বপন করেছিলেন, আর আমি সেই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
ডাঃ রায় উল্লেখ করেন, উত্তর-পূর্বে বিজেপির রাজনৈতিক যাত্রায় বারাক উপত্যকার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বারাক উপত্যকা থেকে বিজেপির নয়জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা এই অঞ্চলে দলের প্রথম বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল।
তিনি আরও বলেন, তাঁর পিতা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিমলাংশু রায় ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে জনসংঘের টিকিটে নির্বাচনও লড়েছিলেন এবং সম্ভবত এই অঞ্চলে জনসংঘের অন্যতম প্রাচীন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন।
“আমার পিতার দীর্ঘ জনজীবন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আমার ওপর আস্থা রাখেন যে আমি তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। মানুষের এই বিশ্বাসে আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব মানুষের সেবা করার,” বলেন ডাঃ রায়।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিলচরের সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডাঃ রায় বলেন, বারাক উপত্যকার মানুষ এবং বিভিন্ন সময়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে তিনি সবসময় সরব থেকেছেন।
তিনি বলেন, “নির্যাতিত মানুষের অধিকার নিয়ে আমি সবসময় কথা বলেছি। যেকোনো সমস্যা হলে মানুষ আমার কাছে আস্থা নিয়ে আসেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েও আমি বিস্তর কথা বলেছি। আমি বিমলাংশু রায়ের পুত্র হতে পেরে গর্বিত এবং তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শ পূরণে কাজ চালিয়ে যাব।”

Send your resume:
biswa@jigyasu.co.in
krcfoundation@gmail.com
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর জনজীবনে সক্রিয় থাকতে পারলে তিনি তাঁর পিতার বহু স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
“আমি বিশ্বাস করি, আগামী ১০-১৫ বছর জনজীবনে থাকলে বাবার বহু স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজ পূরণ করতে পারব,” তিনি বলেন।
বারাক উপত্যকার উন্নয়নে পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকার
বারাক উপত্যকার উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে ডাঃ রায় পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলেন।
“উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো সংযোগ ব্যবস্থা। বারাক উপত্যকার ভেতরে এবং বাইরের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আরও উন্নত করতে হবে। এতে বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে,” তিনি বলেন।
রেলপথ সম্প্রসারণকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বাড়তি রেললাইন ও উন্নত রেল অবকাঠামো এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা পূরণে অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, “বারাক উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে আরও রেললাইন ও উন্নত রেল যোগাযোগ প্রয়োজন। এতে মানুষ ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং অঞ্চল দ্রুত এগোবে।”
বারাক উপত্যকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরকে তিনি “গেম-চেঞ্জার” বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। “গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর প্রকল্প বারাক উপত্যকার জন্য এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনবে। এটি বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প হবে,” বলেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ জলপথ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, জলপথ পরিবহন খরচ কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি শ্রীভূমি ও বদরপুর দিয়ে আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজ চলাচল শুরু হবে। জলপথে পণ্য পরিবহন হলে খরচ অনেক কমবে এবং তার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়বে।” পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ডিজিটাল অবকাঠামো ও উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবার কথা উল্লেখ করেন।
“আমি চাই পুরো বারাক উপত্যকায় ৫জি পরিষেবা পৌঁছে যাক। এখানকার ছাত্রছাত্রীরা যেন দেশের ও বিশ্বের সর্বশেষ তথ্য, শিক্ষা ও সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে,” তিনি বলেন। এছাড়াও দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপরও জোর দেন ডাঃ রায়। তিনি বলেন, উন্নত রাস্তা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জলজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি।
“ভাল রাস্তা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন দরকার। খোলা নালা ঢেকে দিতে হবে এবং জলজটের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হবে। এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত,” তিনি বলেন।
মণিপুরে শান্তি ফিরবে বলে আশাবাদী
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ডাঃ রায় বলেন, গত কয়েক বছরের ঘটনাবলি দুর্ভাগ্যজনক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, “মণিপুরে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। একই সঙ্গে অনেক বিষয় অতিরঞ্জিত করা হয়েছে এবং ভুয়ো বর্ণনাও ছড়ানো হয়েছে। এর ফলে শান্তি ও সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তবে তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন স্তরে উদ্যোগ নিয়েছে।
“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। ভারত সরকার সক্রিয় পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে একাধিক স্তরে কাজ চলছে,” তিনি বলেন। সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
“আমরা আশা করছি নাগরিক সমাজ আরও সক্রিয়ভাবে শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। আগামী দিনে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি,” বলেন তিনি। মণিপুরে নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুকূল হলেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হবে।
“যখন পরিস্থিতি উপযুক্ত হবে, তখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিজেপি সরকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে,” তিনি বলেন।
শেষে ডাঃ রায় মণিপুরের মানুষকে শান্তিপ্রিয় ও দৃঢ়চেতা বলে উল্লেখ করেন।“মণিপুরের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং অসাধারণ মানুষ। আমি আশাবাদী, বর্তমান সংকট কাটিয়ে রাজ্য আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে,” তিনি বলেন।



