২১ ও ২২ অক্টোবর প্রতিমা নিরঞ্জন, রাস্তার উপর প্যান্ডেল তৈরিতে অনুমতি নয়; ডিজে-র দাপট রুখতে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস প্রশাসনের
শিলচর: দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যানজট নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ, রাস্তা মেরামতি, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রতিমা নিরঞ্জনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি জোরদার করল শিলচর পুরনিগম (এসএমসি)। পুজোর দিনগুলিতে শহরবাসী ও দর্শনার্থীদের যাতে কোনও অসুবিধায় পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দফতর ও পুজো কমিটিগুলির মধ্যে সমন্বয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার শিলচর পুরনিগমের সম্মেলন কক্ষে কার্যনির্বাহী আধিকারিক অভিজিৎ বে-র সভাপতিত্বে প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ছিলেন উদারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা, কাছাড়ের সহকারী কমিশনার মাসি টোপনো, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি তৈমুর রাজা চৌধুরী, বিশিষ্ট নাগরিক মৃদুল মজুমদার ও বাবুল হোরে, এপিডিসিএলের ডিরেক্টর নিত্যভূষণ দে, আইনজীবী দুলাল মিত্র-সহ বিভিন্ন দফতরের আধিকারিক ও সমাজের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকের শুরুতে অভিজিৎ বে বলেন, দুর্গাপুজোয় শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল জনসমাগম হয়। তাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উদ্যাপনের জন্য পুজো কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব পুজোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও নাগরিক পরিষেবা সচল রাখার উপরও জোর দেন তিনি।
রাস্তার উপর প্যান্ডেল নয়, ডিজে নিয়ন্ত্রণে জোর
বৈঠকে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো এবং বিশেষ করে ডিজে ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে ব্যবহারের ফলে শব্দদূষণ ও অন্যান্য সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন উপস্থিত প্রতিনিধিরা।
পুজো কমিটিগুলিকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাস্তার উপর প্যান্ডেল তৈরি করলে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করে পুরনিগমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাস্তার উপর প্যান্ডেল তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে না।
পুজোর আগে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ওয়ার্ডভিত্তিক দল গঠন করা হয়েছে। শ্রমিক ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মীদের নিয়ে গঠিত এই দলগুলি নর্দমা পরিষ্কার এবং রাস্তার পাশের আবর্জনা অপসারণের কাজ করবে। শহরের খারাপ বা অকেজো পথবাতি মেরামত ও প্রয়োজনে বদলে দেওয়ার জন্য পুরনিগমের ইউটিলিটি শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুজো মণ্ডপের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জীবাণুনাশক ছড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুরনিগমের পরিদর্শককে।
যানজট ও জল-বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ
বৈঠকে উদারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা শিলচর পুর এলাকার যানজট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জল সরবরাহ এবং নর্দমা পরিষ্কারের সমস্যা তুলে ধরেন। পুজোর সময় পর্যাপ্ত পথবাতি ও জল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে দ্রুত পদক্ষেপ করার আহ্বান জানান তিনি।
রাস্তা খুঁড়ে গর্ত তৈরি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পুজো কমিটিকে তার দায় নিতে হবে বলেও সতর্ক করেন বিধায়ক। পুজোর দিনগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এপিডিসিএল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
শহরের যানজটের প্রসঙ্গে মৃদুল মজুমদার শ্মশানঘাটের কাছে থাকা রাস্তাটিকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দেন। পর্যাপ্ত পথবাতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। রাঙ্গিরখাড়িতে মূল রাস্তার উপর গর্ত খোঁড়ার সমস্যা এবং শহরের রাস্তায় অবাধে গবাদি পশুর চলাচল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মালুগ্রাম ও ঘনিয়ালা এলাকায় পূর্ত দফতরের রাস্তা মেরামতির কাজে বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানান তৈমুর রাজা চৌধুরী। বৈঠকের কার্যবিবরণী বাংলায় তৈরি করারও আবেদন জানান তিনি। পাশাপাশি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের পরিবেশে দুর্গাপুজো পালনের জন্য শহরবাসীর কাছে আবেদন জানান।
শব্দদূষণ কমালে পুজো কমিটিকে পুরস্কারের প্রস্তাব
আইনজীবী তথা বিশিষ্ট নাগরিক দুলাল মিত্র ডিজে ও অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দেন। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং পরিবেশ রক্ষায় ভালো কাজ করা পুজো কমিটিগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
তাঁর প্রস্তাব, প্রতিমা নিরঞ্জন পর্ব শেষ হওয়ার পর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শব্দ ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেওয়া পুজো কমিটিগুলিকে পুরস্কৃত করা যেতে পারে।
কাছাড়ের সহকারী কমিশনার মাসি টোপনো জানান, ডিজে নিয়ন্ত্রণ ও শব্দদূষণ রোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতরের কাছ থেকে গত পাঁচ বছরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এপিডিসিএলের ডিরেক্টর নিত্যভূষণ দে প্রতিমা নিরঞ্জনে বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে মালুগ্রাম এলাকার প্রতিমা নিরঞ্জন প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে শেষ করার উপর জোর দেন তিনি। প্রতিমাবাহী ট্রাকের চলাচল সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ডাকবাংলো ত্রিমোহনায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
২১ ও ২২ অক্টোবর প্রতিমা নিরঞ্জন
বৈঠকে জানানো হয়, আগামী ২১ ও ২২ অক্টোবর দুর্গাপ্রতিমা নিরঞ্জন করা হবে। কাছাড়ের জেলাশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দু’দিনের মধ্যেই নিরঞ্জন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
সদরঘাট নিরঞ্জনস্থলে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির জন্য কাছাড় বন দফতর বিনামূল্যে পাঁচ ট্রাক করে বালি, পাথরকুচি, ক্রাশার ডাস্ট এবং লাল মাটি সরবরাহ করবে। অভ্যন্তরীণ জল পরিবহণ দফতরের কার্যনির্বাহী বাস্তুকার নিরঞ্জনের জন্য একটি মোটরবোট এবং উদ্ধারকাজের জন্য একটি লঞ্চের ব্যবস্থা করবেন। নিরঞ্জন শুরুর আগেই সেগুলি যথাযথভাবে স্থাপন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিলচর পুরনিগমের সহকারী কার্যনির্বাহী বাস্তুকারকে।
নিরঞ্জনস্থলে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কাছাড়ের পুলিশ সুপারকে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নজরদারি চালাবেন সদর সার্কেলের সার্কল অফিসার। পাশাপাশি, নিরঞ্জন চলাকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের ব্যবস্থা করবে ম্যাজিস্ট্রেসি শাখা।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদরঘাটে উদ্ধারকারী নৌকাসহ জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (এসডিআরএফ) দল মোতায়েনের সমন্বয় করবে কাছাড় জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ। দু’দিনের নিরঞ্জন পর্বে পালা করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দল রাখার ব্যবস্থা করবে স্বাস্থ্য পরিষেবার যুগ্ম অধিকর্তার দফতর।
যানজট এড়াতে ট্রাফিক বিভাগকে কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুজোর আগে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও গর্ত মেরামতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পূর্ত দফতর এবং এনএইচআইডিসিএল-কে। অন্যদিকে, পুজোর দিনগুলিতে পর্যাপ্ত জল সরবরাহ নিশ্চিত করবে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর, অম্রুত এবং সংশ্লিষ্ট জল সরবরাহ সংস্থাগুলি।
প্রতিমা নিরঞ্জনের কাজে সহায়তার জন্য প্রতিটি পুজো কমিটিকে অন্তত ১০ জন শ্রমিকের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তায় যৌথ উদ্যোগ
পুজো মণ্ডপগুলিতে উপযুক্ত জায়গায় ডাস্টবিন রাখা, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রদর্শনের উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পুরনিগম, বিভিন্ন সরকারি দফতর এবং পুজো কমিটিগুলিকে যৌথভাবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, শব্দদূষণ কমানো এবং পরিবেশের ক্ষতি এড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরাপদে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সভাপতির ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে বৈঠক শেষ হয়। দুর্গাপুজো ২০২৬-কে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এই তথ্য জানানো হয়েছে শিলচরের বরাক উপত্যকা অঞ্চলের তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে।


