উত্তর-পূর্বে ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকি, সবচেয়ে বেশি কাঁপতে পারে শিলং-গুয়াহাটি

3 - মিনিট |

গবেষণায় পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সিলারেশন ডিবাংয়ে ০.৯০৮ g, শিলংয়ে ০.৮৯৩ g, গুয়াহাটিতে ০.৮১১ g; মাটি, ভূতাত্ত্বিক গঠন ও পাহাড়ি ঢালই ঠিক করবে ক্ষতির মাত্রা

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

গুয়াহাটি: উত্তর-পূর্ব ভারতের কোথায় ভূমিকম্পের কম্পন সবচেয়ে তীব্র হতে পারে, তার একটি নতুন ছবি সামনে আনল আন্তর্জাতিক গবেষণা। গবেষণায় অরুণাচল প্রদেশের ডিবাং, মেঘালয়ের শিলং এবং অসমের গুয়াহাটিকে সম্ভাব্য উচ্চ ভূকম্পন-ঝুঁকির এলাকার মধ্যে রাখা হয়েছে। অন্য দিকে ইম্ফল, ইটানগর, আগরতলা ও কোহিমায় মাঝারি মাত্রার ঝুঁকি এবং আইজলে তুলনামূলক কম আনুমানিক ভূকম্পন নথিভুক্ত হয়েছে।

গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চিলির ইউনিভার্সিদাদ ক্যাটোলিকা দেল নর্তের গবেষক রঞ্জিত দাস, যিনি আগে ইউনেস্কোর ভূমিকম্প-ঝুঁকি মডেলিং সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গবেষণায় আইআইটি বম্বের গবেষকরাও অংশ নিয়েছেন।

গবেষকরা ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য কম্পনের মাত্রা ও সম্ভাবনা নির্ধারণে প্রবাবিলিস্টিক সিসমিক হ্যাজার্ড অ্যানালিসিস (PSHA) পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণবিধি তৈরিতেও এই ধরনের বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়।

ডিবাং, শিলং, গুয়াহাটিতে কম্পনের মাত্রা বেশি

গবেষণায় ভূমিকম্পের কম্পনের তীব্রতা বোঝাতে পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সিলারেশন (PGA) ব্যবহার করা হয়েছে। এই হিসাবে ডিবাংয়ের কাছে PGA-এর আনুমানিক মান ০.৯০৮ g, শিলংয়ে ০.৮৯৩ g এবং গুয়াহাটিতে ০.৮১১ g।

ইটানগর, ইম্ফল, কোহিমা ও আগরতলায় এই মান ছিল প্রায় ০.৬১ g থেকে ০.৭০ g-এর মধ্যে। আইজলে আনুমানিক PGA ছিল ০.৫৭ g।

তবে গবেষকদের বক্তব্য, শুধু কোনও শহরের PGA-এর সংখ্যা দেখেই সেখানে ভূমিকম্পে কতটা ক্ষতি হবে, তা বলা যায় না। মাটি ও শিলার ধরন, স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক গঠন, ভবনের নকশা এবং পাহাড়ের ঢালের মতো বিষয়ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে।

গুয়াহাটিতে নরম মাটি, শিলংয়ে শক্ত শিলা

গুয়াহাটি এবং তেজপুর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নরম পলিমাটির উপর অবস্থিত। বড় ভূমিকম্প হলে এই ধরনের মাটিতে কম্পন আরও বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে জলসিক্ত মাটি সাময়িক ভাবে শক্তি হারিয়ে লিকুইফ্যাকশন-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

ফলে এই ধরনের এলাকায় ভবন নির্মাণে উপযুক্ত ভিত্তি নকশা এবং ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শিলংয়ের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। শহরের বড় অংশ শক্ত প্রিক্যামব্রিয়ান শিলার উপর এবং সক্রিয় ফল্টের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে সেখানে নরম মাটির কম্পন-বর্ধনের বদলে তীব্র ও উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির কম্পন বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

গবেষক রঞ্জিত দাসের মতে, শিলংয়ে ভবনের নকশায় পর্যাপ্ত কাঠামোগত দৃঢ়তার উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

ইম্ফল-আগরতলায় ‘বেসিন এফেক্ট’, পাহাড়ে ধসের আশঙ্কা

ইম্ফল ও আগরতলার বিস্তীর্ণ অংশ পলল ও সেডিমেন্টারি জমির উপর গড়ে উঠেছে। ফলে ভূমিকম্পের সময় স্থানীয় ভাবে কম্পনের ধরন বদলে যেতে পারে। এই কারণে ওই শহরগুলিতে বিস্তারিত সিসমিক মাইক্রোজোনেশন এবং জায়গাভিত্তিক নির্মাণ নকশা গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

অন্য দিকে কোহিমা ও ইটানগরের মতো পাহাড়ি এলাকায় ভূমিকম্পের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঝুঁকি হল ভূমিধস। গ্যাংটক ও আইজলেও শক্ত শিলার এলাকা রয়েছে, কিন্তু খাড়া পাহাড়ি ঢালের কারণে সেখানেও ভূমিকম্প-পরবর্তী ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষকদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় তুলনামূলক হালকা কাঠামো এবং ঢাল সুরক্ষার ব্যবস্থা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

৯,৯৬৮টি ভূমিকম্পের তথ্য, মাপার পদ্ধতিতেও প্রশ্ন

গবেষণায় মোট ৯,৯৬৮টি ভূমিকম্পের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গবেষকদের দাবি, প্রচলিত ‘মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড’ স্কেলের পরিবর্তে তাঁরা দাস ম্যাগনিটিউড স্কেল ব্যবহার করেছেন।

রঞ্জিত দাস ও তাঁর সহকর্মীদের বক্তব্য, ৭.৫-এর কম মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে প্রচলিত স্কেল ব্যবহার করলে কিছু পরিস্থিতিতে ভূমিকম্পের শক্তি ও তার ফলে সম্ভাব্য কম্পনের হিসাব উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৭৫ বছরের হ্যাজার্ড স্তরে প্রচলিত স্কেল ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে ডাস ম্যাগনিটিউড স্কেলের তুলনায় গ্রাউন্ড-মোশন বা ভূকম্পন অনুমান ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। বিশেষ করে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বেশি দেখা গেছে।

শুধু পুরনো রেকর্ড দিয়ে ঝুঁকি মাপা যথেষ্ট নয়

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হল উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূমিকম্পের রেকর্ড এখনও সীমিত। ফলে অতীতের নথির উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে অত্যন্ত বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

রঞ্জিত দাস জানিয়েছেন, ১৯৮৭ ও ১৯৫০ সালের বড় ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের মধ্যবর্তী হিমালয়ান প্লেট সীমান্তের একটি অংশে তুলনামূলক কম কম্পনের হিসাব পাওয়া গেলেও তার একটি কারণ হতে পারে পর্যাপ্ত ভূমিকম্পের তথ্যের অভাব।

তাঁর মতে, উত্তর-পূর্বে প্রায় ১ g-এর কাছাকাছি কম্পন অস্বাভাবিক নয়। ১৯৫০ সালের অসম ভূমিকম্পের সময় অত্যন্ত তীব্র কম্পন এবং অগভীর ফোকাল গভীরতার উল্লেখ করে তিনি এই সতর্কতা দিয়েছেন।

তাঁর কথায়, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভূমিকম্পটির মাত্রার উপর নির্ভর করে না। মাটি ও শিলার বৈশিষ্ট্য কম্পনকে অনেকটা বাড়িয়েও দিতে পারে, আবার কমিয়েও দিতে পারে।

শহরভিত্তিক নয়, জায়গাভিত্তিক প্রস্তুতি জরুরি

গবেষণার মূল বার্তা তাই শুধু কোন শহর ‘বেশি ঝুঁকিপূর্ণ’—এই তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। একই শহরের মধ্যেও মাটি, শিলা, ভূগর্ভস্থ জল এবং ভূপ্রকৃতির পার্থক্যের কারণে ভূমিকম্পের প্রভাব আলাদা হতে পারে।

এই কারণে উত্তর-পূর্বে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকম্প-ঝুঁকি মূল্যায়নে ভূমিকম্পের পুরনো রেকর্ডের পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক গঠন, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং নির্দিষ্ট এলাকার তথ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।

সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা সেই দিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। উত্তর-পূর্বের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ এবং বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এই ধরনের স্থানভিত্তিক তথ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, গবেষণাটি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *