আগামী মাসের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানালেন টিপ্রা মথার প্রতিষ্ঠাতা; স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত কারণের কথা বললেও আদিবাসী অধিকার নিয়ে সরব থাকার বার্তা
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
আগরতলা: ত্রিপুরার গ্রাম কমিটি নির্বাচনে বিপুল সাফল্যের কয়েক দিনের মধ্যেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেন টিপ্রা মথার প্রতিষ্ঠাতা প্রড্যোত কিশোর মানিক্য দেববর্মা। আগামী মাসের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলেও ত্রিপুরার মানুষের বিভিন্ন সমস্যা এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে নিজের জনজীবনের ভূমিকা বজায় রাখবেন বলে স্পষ্ট করেছেন প্রড্যোত।
স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ব্যক্তিগত চাপ তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে সক্রিয় রাজনীতি ছাড়ার অর্থ জনজীবন থেকে সম্পূর্ণ সরে যাওয়া নয় বলেও জানিয়েছেন টিপ্রা মথার প্রতিষ্ঠাতা। ত্রিপুরার মানুষের স্বার্থে প্রয়োজন হলে তিনি কথা বলবেন এবং হস্তক্ষেপ করবেন বলে তাঁর বক্তব্য।
গ্রাম কমিটি ভোটে বড় জয়
প্রড্যোতের এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন সদ্য শেষ হওয়া গ্রাম কমিটি নির্বাচনে টিপ্রা মথা বড় সাফল্য পেয়েছে। ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল বা টিটিএএডিসির অধীন ৫৮৭টি গ্রাম কমিটির ৪,৫৯৪টি আসনে ভোট হয়েছিল। এর মধ্যে টিপ্রা মথা ৩,৪২৮টি আসনে জয় পেয়েছে।
প্রায় এক দশক পর টিটিএএডিসি এলাকায় এই গ্রাম কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফলকে দলের সাংগঠনিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হলেও প্রড্যোত নিজে কৃতিত্ব কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নামে দিতে চাননি।
তাঁর বক্তব্য, এই জয় আসলে ত্রিপুরার মানুষের। সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, সৎ ভাবে কাজ করা এবং গ্রামস্তরে মানুষের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘জয়ই শেষ কথা নয়’
প্রড্যোতের রাজনৈতিক যাত্রার কেন্দ্রে ছিল ত্রিপুরার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। টিপ্রা মথা গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি।
এই রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ টিপ্রাসা অ্যাকর্ড। ২০২৪ সালের এই চুক্তির বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র ও ত্রিপুরা সরকারের উপর চাপ বাড়ানোর কথাও বারবার বলেছেন প্রড্যোত।
চুক্তির আওতায় আদিবাসীদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার, জমি, ভাষা, শিক্ষা এবং আর্থ-সামাজিক অধিকারের মতো বিষয়গুলি নিয়ে পদক্ষেপের কথা রয়েছে।
প্রড্যোতের বক্তব্য, গ্রাম কমিটি নির্বাচনের জয়কে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না। টিপ্রাসা অ্যাকর্ডের প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়িত হলেই প্রকৃত অর্থে সেই সাফল্য উদ্যাপন করা যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লেও থাকছেন জনজীবনে
সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের মধ্যেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চাননি প্রড্যোত। তিনি জানিয়েছেন, ত্রিপুরার আদিবাসী ও বাঙালি—দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পাশেই থাকবেন এবং রাজ্যে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য কাজ করে যাবেন।
গ্রাম কমিটি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরও তিনি সমর্থকদের শান্ত থাকার এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংঘর্ষে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ফলে তাঁর ঘোষণাকে আপাতত নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে, জনজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিদায় হিসেবে নয়।
টিপ্রা মথার সামনে নতুন প্রশ্ন
প্রড্যোতের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা টিপ্রা মথার জন্যও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। গ্রাম কমিটি নির্বাচনে দলটি টিটিএএডিসি এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি আরও জোরালো করেছে। একই সঙ্গে ত্রিপুরার শাসক জোটের অংশ হিসেবেও দলটির ভূমিকা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠাতা ও দলের প্রধান মুখ সক্রিয় রাজনীতির দৈনন্দিন কাজ থেকে সরে গেলে সংগঠনের নেতৃত্ব কী ভাবে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে টিপ্রাসা অ্যাকর্ড বাস্তবায়নের দাবি, আদিবাসী অধিকার এবং ত্রিপুরার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নে দলের ভবিষ্যৎ অবস্থান কতটা বদলায়, তা-ও নজরে থাকবে।
প্রড্যোতের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক বিরতি নয়। গ্রাম কমিটি নির্বাচনে বড় জয়ের পর টিপ্রা মথার সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং ত্রিপুরার আদিবাসী রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কী ভাবে বজায় থাকে, সেই প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।


