‘মাছি মারতে হাতুড়ি নয়’, মেট্রো-রেল বিধিনিষেধ শিথিল করতে কেন্দ্রকে বলল সুপ্রিম কোর্ট

3 - মিনিট |

১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ-প্রস্থান বন্ধ ও একাধিক ট্রেন বাতিল নিয়ে আপত্তি শীর্ষ আদালতের; নিরাপত্তা বজায় রেখেও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সচল রাখার নির্দেশ

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

নয়াদিল্লি:বিক্ষোভের আশঙ্কায় দিল্লিতে মেট্রো ও রেল পরিষেবার উপর ব্যাপক বিধিনিষেধ নিয়ে কেন্দ্রকে সতর্ক করল সুপ্রিম কোর্ট। নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না—শুক্রবার এই অবস্থান স্পষ্ট করে আদালত জানায়, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, কিন্তু তার ফলে সাধারণ নাগরিকদের অযথা দুর্ভোগে ফেলা চলবে না।

ককোরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের ১০ অক্টোবরের প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে সামনে রেখে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বেরোনোর গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, শনিবার রাজধানীতে পৌঁছনোর কথা থাকা একাধিক ট্রেনও বাতিল করা হয়। এই বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া আবেদনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলে, মেট্রো ও রেল পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও ভি মোহনাও ওই বেঞ্চের সদস্য ছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্ভাব্য বিপদের অনুপাতে হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা উচিত নয়।”

‘সবাইয়ের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই’

কেন্দ্রের হয়ে আদালতে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রিতভাবে মেট্রো ও অন্যান্য রেল পরিষেবা চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হবে।

আদালত এই আশ্বাস নথিভুক্ত করে জানায়, যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা এক বিষয় নয়। সাধারণ মানুষের চলাচল কতটা ব্যাহত হচ্ছে, সেটিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনা করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, গুরুগ্রাম, গ্রেটার নয়ডা এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের অন্যান্য এলাকা থেকে প্রতিদিন বহু মানুষ কাজ, পড়াশোনা ও জরুরি প্রয়োজনে দিল্লিতে আসেন। তাঁদের সকলের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। অনেকেই মেট্রো ও রেল পরিষেবার উপর নির্ভরশীল। তাই নিরাপত্তার নামে এই পরিষেবাগুলি কার্যত বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

মহিলা, শিশু, প্রবীণ নাগরিক এবং অসুস্থ মানুষের যাতায়াতের বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলে আদালত। রাস্তা বন্ধ করা এবং ব্যারিকেড বসানোর সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করে যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেয় বেঞ্চ। মেট্রো ও রেল পরিষেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে স্পষ্টভাবে জানাতেও কেন্দ্রকে বলা হয়েছে।

মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ট্রেন বাতিল নিয়ে প্রশ্ন

আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবল জানান, শনিবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছনোর কথা থাকা একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, দিল্লির বাইরের বহু দূরবর্তী শহর থেকে যাত্রা শুরু করা ট্রেনও এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজধানীতে পৌঁছতে পারবে না। কেরল থেকে আসা কয়েকটি ট্রেনের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেগুলির দিল্লিতে পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১টার মধ্যে।

মেট্রো পরিষেবা সংক্রান্ত নির্দেশেও অসংগতি রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। একদিকে মেট্রোর ট্রেনের সংখ্যা বা চলাচলের ব্যবধান কমানোর পরামর্শ, অন্যদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান বন্ধ রাখার নির্দেশ—দু’টি ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়, তা জানতে চায় আদালত।

তুষার মেহতা প্রথমে জানান, কয়েকটি স্টেশনে মেট্রোর চলাচলের ঘনত্ব কমানোর কথা বলা হয়েছিল। পরে তিনি আশ্বাস দেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করা হবে।

আদালত আরও জানায়, শুধু যাত্রী নয়, আদালতের কর্মী, আইনজীবীদের সহকারী, ক্যান্টিন কর্মী এবং অন্যান্য কর্মচারীদেরও কাজে পৌঁছতে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ব্যক্তিগত পরিবহণের ব্যবস্থা নেই, তাঁদের দুর্ভোগ বিবেচনায় রাখা জরুরি।

আগের বিক্ষোভের নজির তুলে ধরল কেন্দ্র

নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে কেন্দ্র জানায়, আগের একটি বিক্ষোভের জন্য আয়োজকেরা ২০ জুন পুলিশের অনুমতি চেয়েছিলেন। এক দিনের জন্য সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা বা ৫টা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রের দাবি, আয়োজকেরা নির্ধারিত সময়ের পরও ১৭ দিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যান।

সলিসিটর জেনারেলের আরও অভিযোগ, পরে বিক্ষোভকারীরা সংসদ-সংলগ্ন একটি নিষিদ্ধ এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সংঘর্ষে ২০০-রও বেশি পুলিশকর্মী এবং কয়েক জন সাধারণ মানুষ আহত হয়েছিলেন বলে তিনি আদালতকে জানান।

মেহতার বক্তব্য, সরকারের দায়িত্ব শুধু প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষা করা নয়, একই সঙ্গে বৃহত্তর জনসাধারণের নিরাপত্তা ও অধিকারও নিশ্চিত করা। ইন্টারনেট পরিষেবার উপর বিধিনিষেধের প্রসঙ্গেও তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ভবন ও রাইসিনা রোডের আশপাশে আনুমানিক চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এই বিধিনিষেধ সীমিত রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

মসজিদে গিয়ে বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার অভিযোগ

শুনানিতে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে মসজিদে গিয়ে মানুষকে শনিবারের বিক্ষোভে যোগ না দেওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও তোলেন এক সিনিয়র আইনজীবী। তিনি জানান, এ বিষয়ে হলফনামা দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে এবং আদালতে একটি ছবি ও ভিডিয়োও জমা দেওয়া হয়েছে।

এর বিরোধিতা করে তুষার মেহতা বলেন, বিষয়টি যেভাবে তোলা হচ্ছে, তা ন্যায়বিচার চাওয়ার চেয়ে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে। তবে প্রধান বিচারপতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনে এই অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

আগামী ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও পরিবহণ বিধিনিষেধ নিয়ে এই শুনানিতে আদালতের মূল বার্তা স্পষ্ট—আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন অকারণে স্তব্ধ করা চলবে না। মেট্রো ও রেল পরিষেবা কীভাবে নিয়ন্ত্রিতভাবে সচল রাখা যায়, এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেই ভারসাম্যই খুঁজতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *