উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের ঘটনায় বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। আহতদের দেখতে হাসপাতালে অমিত শাহ, ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির অভিযোগে তদন্ত শুরু।
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
কলকাতা:উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৯। শনিবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘটনার তদন্তে নেমে রবিবার সাতজনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন পুজো কমিটির সম্পাদক রাজকুমার সেওড়া, সহ-সভাপতি শান্তনু দুবে এবং বাঁশের কাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা বিপ্লব মুখোপাধ্যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিড় সামলানো ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আরও চারজনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভিআইপি পাস পরীক্ষা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কৌশিক সাহা, পিন্টু দে এবং বেসরকারি নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা সুমন চক্রবর্তী ও রাজেশ পাল। ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫, ১১০ ও ৩(৫) ধারায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। শনিবার রাতেই কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছিল।
শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ উত্তর কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে বিপর্যয় ঘটে। প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে মণ্ডপের বাইরে থাকা বহু মানুষ আশ্রয়ের জন্য ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। একই সময়ে ভিতরে থাকা দর্শনার্থীদের অনেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন। সরু রাস্তা ও একাধিক গলি দিয়ে মানুষের চাপ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে মণ্ডপের বেরনোর পথের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এর জেরে হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং অনেকে একে অপরের উপর পড়ে যান। কয়েকজনের শ্বাসকষ্ট ও দমবন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। আহতদের মধ্যে প্রায় ৪৫ জনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। পরে তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৪ জনকে অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
প্রথমে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে মহিলা, পুরুষ ও শিশুও রয়েছে। ঘটনার পরই চোরবাগানের পুজো বন্ধ করে দেয় পুলিশ। মণ্ডপের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এদিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রবিবার অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। দুর্ঘটনার জেরে তাঁর বেলুড় মঠ সফর-সহ অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবার রাতেই আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান এবং পরিস্থিতির খোঁজ নেন। ঘটনার তদন্তে কলকাতা হাই কোর্টের কোনও বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। এই মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি হয়ে থাকলে পুজো কমিটি বা পুলিশের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স এবং রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) আধিকারিকদেরও তদন্তে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের এক সদস্যকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। আহতদের প্রত্যেককে পাঁচ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। তাঁদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচও সরকার বহন করবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ বা আহতদের সম্পর্কে তথ্য জানতে টোল-ফ্রি হেল্পলাইন নম্বর ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮ চালু করা হয়েছে।
ঘটনার পর কলকাতার বড় পুজোমণ্ডপগুলিতে পরিকাঠামো, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে পৃথক পরিদর্শক দল গঠন করেছে রাজ্য সরকার। চোরবাগান ও সংলগ্ন এলাকায় তিন দিনের জন্য পাঁচ বা তার বেশি মানুষের বেআইনি জমায়েত এবং শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে, এমন কর্মকাণ্ডের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে এখনও সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পুজো কমিটির এক সদস্যের বক্তব্য, কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মণ্ডপের প্রতিমা একটি লোহার কাঠামোর নীচে স্থাপন করা হয়েছিল। কাঠামোর কোনও অংশ ভেঙে পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায়।


