সৌদি আরবের বিমানবন্দর-সহ অসামরিক পরিকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলার নিন্দা ভারতের। বাণিজ্যিক জাহাজ ও ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সংঘাত প্রশমনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌচলাচলের দাবি নয়াদিল্লির।
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
রাষ্ট্রপুঞ্জ: মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের পরিস্থিতিকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করল ভারত। সৌদি আরবের বিমানবন্দর-সহ অসামরিক পরিকাঠামোয় সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলা, বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে সংঘাত প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি তথা রাষ্ট্রদূত হরিশ পর্বতনেনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও শান্তির সঙ্গে ভারতের গভীর স্বার্থ জড়িত। তাঁর কথায়, এই অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন স্বাভাবিক জীবন ও স্থায়ী শান্তি। শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতিই শান্তি নয়, মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিমানবন্দর-সহ অসামরিক পরিকাঠামোয় হামলার তীব্র নিন্দা করে ভারত। এই হামলায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে রিয়াধে ভারতীয় নাগরিক মহম্মদ ইউসুফ আলির মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করেন পর্বতনেনি। সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে সে দেশের সরকার ও জনগণের পাশে থাকার বার্তাও দেন তিনি।
ভারতের বক্তব্য, সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সব পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে। আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমেই বিরোধের সমাধান খুঁজতে হবে।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্য ও সংলগ্ন জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকদের উপর একের পর এক হামলার প্রসঙ্গ তুলে ভারত জানায়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। ভারতীয় পতাকাবাহী ‘এমভি ডিপি ওয়ার্ল্ড কাবেরী’ জাহাজে চলতি সপ্তাহের হামলা এবং গত সপ্তাহে ‘এমটি পেট্রো ডলফিন’ ও ‘এমটি ভ্যালথেরা’ জাহাজে আক্রমণের কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। তার আগের সপ্তাহে ‘এমটি অন পিস’ ও ‘এমটি কাজিমা থ্রি’ জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে জানান তিনি।
পর্বতনেনির কথায়, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলা আইনগত ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য। আক্রান্ত জাহাজগুলির কয়েকটিতে ভারতীয় নাবিক ছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের সরাসরি দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে নিরাপদে পণ্য পরিবহণ বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি। আন্তর্জাতিক আইন মেনে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে বলেও দাবি ভারতের। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষায় সহযোগিতার জন্য ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান পর্বতনেনি।
গত মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ভারত ও লাইবেরিয়া ‘জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বন্ধুদের গোষ্ঠী’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে। আরও ২৩টি সদস্য রাষ্ট্র তাতে যোগ দিয়েছে। নাবিকদের অধিকার রক্ষা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে বারবার হামলা ঠেকাতে দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
ভারতের প্রস্তাবিত ‘নাবিকদের জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্ক’-এর কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত মাসে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এই নেটওয়ার্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিপদবার্তা পাঠানো, চিকিৎসা সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনে উদ্ধারকাজে সংশ্লিষ্ট দেশের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসগুলির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
গাজা, ইয়েমেন ও লেবানন নিয়েও ভারতের বার্তা
ইয়েমেনের প্রসঙ্গে দেশটির ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন পর্বতনেনি। একই সঙ্গে বাব এল-মান্দেব প্রণালী ও দক্ষিণ লোহিত সাগরে নৌচলাচল সুরক্ষিত রাখাকে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ যেন গাজা উপত্যকার মানবিক সংকট থেকে বিশ্বের নজর সরিয়ে না দেয়, সেই আবেদনও জানিয়েছে ভারত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করে নয়াদিল্লি জানায়, সন্ত্রাসবাদের কোনও оправনা নেই। একই সঙ্গে মানবিক সাহায্য, আলোচনা, কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেন রাষ্ট্রদূত।
রাষ্ট্রপুঞ্জের প্যালেস্টাইন শরণার্থীবিষয়ক ত্রাণ ও কর্ম সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-কে ভারত ৫ কোটি ২০ লক্ষ ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংস্থাটিকে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন পর্বতনেনি।
লেবাননে রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্তর্বর্তী শান্তিরক্ষা বাহিনী ইউএনআইএফআইএল-এর উপর হামলারও নিন্দা করেছে ভারত। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য, রাষ্ট্রপুঞ্জের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করা শান্তিরক্ষীদের কখনওই নিশানা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের স্থাপনার নিরাপত্তা ও অলঙ্ঘনীয় মর্যাদা বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউএনআইএফআইএল-এর ভূমিকা শেষ হলে কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকবে, তা নিয়ে প্রস্তুতি এবং লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার উপরও জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নেই; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ এবং সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের জীবনও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতের বক্তব্য, অসামরিক পরিকাঠামো ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করা এবং কূটনৈতিক পথে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।


