গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ভোটের আগে একাধিক রাজ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে আইএসআই-সমর্থিত নেটওয়ার্ক; নজরে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও মণিপুর
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
নয়াদিল্লি:২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশের একাধিক রাজ্যে অস্থিরতা তৈরির ছক কষছে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই—এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। তাদের দাবি, বিশেষ নজরে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও মণিপুর।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, হিমাচলপ্রদেশ, মণিপুর ও গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই ভোটের আগে এবং ভোটপর্বে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যগুলির একটি তালিকা তৈরি করেছে।
এক গোয়েন্দা আধিকারিকের দাবি, আইএসআই-সমর্থিত কার্যকলাপের ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও মণিপুরকে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর বলে মনে করা হচ্ছে।
তাঁর কথায়, উত্তরপ্রদেশে সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং গুপ্তচরবৃত্তি। পাঞ্জাবে অস্ত্র ও মাদক পাচারের পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন গ্রেনেড হামলার আশঙ্কা রয়েছে। মণিপুরে ভোটের আগে ফের ব্যাপক অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই পরিকল্পনার একটি অংশ প্রায় এক বছর আগে সক্রিয় করা হয়। সেই সময় আইএসআইয়ের হয়ে শাহজাদ ভাট্টি ভারতীয় যুবকদের নেটওয়ার্কে টানার কাজ শুরু করেন বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীদের দাবি, ভাট্টির নিয়োগের পরিধি ছিল সর্বভারতীয়। সামান্য টাকার বিনিময়ে কয়েকজন যুবককে বিভিন্ন ধরনের বেআইনি কাজে যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগ করা ব্যক্তিদের সংবেদনশীল ও জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো, সম্ভাব্য হামলার জন্য নজরদারি চালানো, ‘হিট জব’-এ অংশ নেওয়া, মাদক পাচার এবং জাল ভারতীয় নোটের কারবারে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, ভোটমুখী রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবে নিয়োগের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ভোটের আগে এবং ভোট চলাকালীন হামলার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল বলে গোয়েন্দাদের দাবি।
উত্তরপ্রদেশে বিশেষ করে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডের মতো জনবহুল জায়গার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলিতেও নজরদারি চালানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি গোয়েন্দাদের।
পাঞ্জাব নিয়েও আলাদা করে সতর্ক গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। এক আধিকারিকের দাবি, ভোটের আগে রাজ্যে বিপুল পরিমাণ মাদক এবং অস্ত্র ঢোকানোই আইএসআই-সমর্থিত নেটওয়ার্কগুলির অন্যতম লক্ষ্য।
গোয়েন্দাদের বক্তব্য, মাদক ও অস্ত্রের পাচার ইতিমধ্যেই চলছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন গ্রেনেড হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় খলিস্তানপন্থী অপারেটিভদের ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি নিরাপত্তা আধিকারিকদের।
তাঁদের মতে, এই ধরনের হামলার পিছনে দ্বিমুখী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একদিকে খলিস্তানপন্থী প্রচারকে জোরদার করা, অন্যদিকে বারবার ছোটখাটো হিংসার ঘটনা ঘটিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে ব্যস্ত রাখা—যাতে মাদক ও অস্ত্রের কারবার নজর এড়িয়ে চলতে পারে।
তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে মণিপুর। ২০২৩ সালে ভয়াবহ জাতিগত হিংসার পর পরিস্থিতির তীব্রতা কিছুটা কমলেও সংঘাতের একাধিক মূল সমস্যা এখনও অমীমাংসিত। ফলে ভোটের আগে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এক নিরাপত্তা আধিকারিকের মতে, বর্তমানে মণিপুরে পরিস্থিতিকে ২০২৩ সালের তুলনায় কম তীব্র হলেও এখনও ‘লো-ইনটেনসিটি ক্রাইসিস’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গুজব, ভুয়ো তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর প্রচার ছড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
গোয়েন্দাদের মতে, মণিপুরে উত্তেজনা তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। তবে এর পিছনে বৃহত্তর উদ্দেশ্য শুধু মণিপুরকে অশান্ত করা নয়। উত্তর-পূর্বের অন্য রাজ্যগুলিতেও যাতে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে, সেই চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা নিরাপত্তা মহলের।
এক আধিকারিকের দাবি, বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু ‘প্রক্সি’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মণিপুরে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে পারে আইএসআই। লক্ষ্য হতে পারে নির্বাচনের বছরকে কেন্দ্র করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যার প্রভাব ধীরে ধীরে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির এই সতর্কবার্তায় যে সম্ভাব্য হুমকির কথা বলা হয়েছে, সেগুলি এখনও আশঙ্কা ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের পর্যায়ে। ভোটের আগে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।


