কভিড নিষেধাজ্ঞার জেরে স্কুল খোলা না গেলেও অন্তত অনলাইন পাঠে বৈষম্য কাটাতে নজর দেওয়া জরুরি।
KRC Times Desk
পড়াশোনার আইনি অধিকার থেকে যাচ্ছে খাতায় কলমে। আর্থিক বিচারে সঙ্কটাপন্ন অংশের ছাত্রছাত্রীরা বাস্তবে পড়াশোনার সুযোগই পাচ্ছে না। লকডাউনের মতো নিষেধাজ্ঞার কারণে পারিবারিক সঙ্কট একটি কারণ। আরও নির্দিষ্ট করলে দেখা যাচ্ছে এই অংশের প্রায় কারও সারাদিন পড়াশোনার জন্য স্মার্টফোন নেই। অনলাইন শিক্ষায় এই বঞ্চনা চিহ্নিত হয়েছে গত বছরই, লকডাউন শুরু হওয়ার কয়েকমাস পর থেকেই। বঞ্চনা ছড়িয়ে রয়েছে বিশ্বজুড়ে, দেখিয়েছে ইউনেস্কো রিপোর্ট।
শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এই ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ কাটাতে সরাসরি সরকারি অনুদানের দাবি তুলছেন। বেঙ্গালুরুর একটি এনজিও অনলাইন শিক্ষায় সব অংশের শিশুকে সক্ষম করার পক্ষে নির্দেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছে। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের মৌলিক অধিকার বিপন্ন করছে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহারের এই আর্থিক অসামর্থ্য। সরকারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। এই আবেদনে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার রক্ষায়।
২০০৯ সালে পাশ শিক্ষার অধিকার আইনে আর্থিক বিচারে দুর্বল অংশের শিশুদের স্কুলে পড়া নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আইনের ১২(১) ধারায় বলা হয়েছে, বেসরকারি স্কুলেও ২৫ শতাংশ আসন আর্থিক বিচারে দুর্বল অংশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। তার জন্য ব্যয়ভার নেবে সরকার। বাস্তবে যদিও এই ধারার প্রয়োগ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে শিক্ষামহলে। বাস্তব অভিজ্ঞতাতেও দেখা যাচ্ছে না যে মোটা মাস মাইনের বেসরকারি স্কুলে আসা-যাওয়া করছে আর্থিক সঙ্কটাপন্ন পরিবারের শিশু-কিশোররা। কিন্তু এমন কিছু স্কুলে খোঁজখবর করে দেখা গিয়েছে, এই অংশ ক্লাসের বাকিদের তুলনায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। কারণ তাদের পরিবারে আলাদা করে তাদের জন্য স্মার্টফোন নেই। অথচ বেসরকারি স্কুলে ক্লাস চলছে অনলাইনে। বস্তুত এই ছাত্রছাত্রীরা ড্রপআউট হয়ে যাচ্ছে।
স্কুল বন্ধ থাকায় একটি অংশ যে পড়াশোনার বাইরে চলে যাচ্ছে গত বছরের বিভিন্ন সময়ে তা বলেছেন শিক্ষক এবং ছাত্র সংগঠনগুলির নেতানেত্রীরা। একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে সমস্যার অনেকগুলি ধরন রয়েছে। অনেকক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছাত্র বা ছাত্রী বাড়ির কমে যাওয়া রোজগার সামলাতে আয়ের খোঁজে নেমে পড়েছেন। বহু ঘটনায় দেখা গিয়েছে বড়দের কাজে সহায়তা করছে স্কুলস্তরের ছাত্রছাত্রীরা। সরকারি স্কুলেও অনলাইন নিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। পুরোটাই করেছেন নিজেদের খরচা এবং উদ্যোগে। সরকারের তরফে নির্দিষ্ট কোনও নির্দেশিকা বা স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট জনিত অসামর্থ্য মেটানোর ব্যবস্থা থাকেনি। শিক্ষকরাই ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্লাস চালিয়েছেন। ক্লাস করতে না পারা ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য করতে বলেছেন অন্যদের।
শিক্ষকদের একাংশ বলেছেন, প্রায় ৭০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীই ক্লাস করতে পারছে না। কিছুক্ষেত্রে সমস্যা হলো বাড়িতে ইন্টারনেট থাকলেও তা বড়দের রোজগারের জন্য দরকার হয়। ফলে পড়াশোনার জন্য দিনভর ছোটদের কাছে স্মার্টফোন রাখার উপায় নেই। তার ওপর রয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ, অর্থাৎ ডেটা বাবদ খরচ। মোবাইল পরিষেবাদাতা সংস্থাগুলি চড়া হারে বাড়িয়েছে ডেটা প্যাকেজের দাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড নিষেধাজ্ঞার জেরে স্কুল খোলা না গেলেও অন্তত অনলাইন পাঠে বৈষম্য কাটাতে নজর দেওয়া জরুরি।


