নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে সব স্থায়ী সদস্যের সমান অধিকার ও দায়িত্বের দাবি নয়াদিল্লির, আট দশক আগের বিশ্বব্যবস্থার বদলে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন চায় ভারত
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
নিউইয়র্ক: রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্যপদ তৈরি করা হলেও তাদের ভেটো ক্ষমতা না দিলে সেই সদস্যদের কার্যত ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ মর্যাদায় নামিয়ে আনা হবে। এমনই স্পষ্ট অবস্থান জানাল ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য, যত দিন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকবে, তত দিন সংস্কার হওয়া পরিষদের প্রত্যেক স্থায়ী সদস্যেরই সেই অধিকার থাকা উচিত। অন্যথায়, নতুন সদস্য যুক্ত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একচেটিয়া প্রভাব অটুট থাকবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পার্বতানেনি সোমবার সাধারণ পরিষদের আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়ায় ভেটো ক্ষমতা নিয়ে বিতর্কে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, স্থায়ী সদস্যের নতুন একটি শ্রেণি তৈরি করে তাদের ভেটো ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখলে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্যে মৌলিক কোনও পরিবর্তন আসবে না। বরং যে বৈষম্য দূর করার জন্য সংস্কারের দাবি উঠেছে, তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
পাঁচ দেশের ক্ষমতা কি অটুটই থাকবে?
বর্তমানে ১৫ সদস্যের রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য—আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চিন। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই পাঁচ দেশের ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। বাকি ১০টি আসনে সদস্যরা নির্বাচিত হন দুই বছরের জন্য।
ভারতের বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করা হলেও তাদের ভেটো ক্ষমতা না দিলে পুরনো ক্ষমতার কাঠামো বদলাবে না। পার্বতানেনির কথায়, স্থায়ী সদস্যপদ ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হওয়ার ধারণা মৌলিকভাবে আলাদা। তাই দীর্ঘমেয়াদি সদস্যপদ তৈরি করে তাকে স্থায়ী সদস্যপদের সমতুল্য বলে দেখানো হলে পরিষদের কাঠামোগত বৈষম্য দূর হবে না।
১৯৬৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদের একমাত্র সম্প্রসারণের উদাহরণও তুলে ধরেছেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। সে সময় নির্বাচিত সদস্যের সংখ্যা ছয় থেকে বাড়িয়ে ১০ করা হয়েছিল, কিন্তু স্থায়ী সদস্যের সংখ্যা পাঁচই রাখা হয়। ভারতের মতে, এর ফলে স্থায়ী ও নির্বাচিত সদস্যের অনুপাত ৫:৬ থেকে ৫:১০-এ বদলে যায় এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের আপেক্ষিক প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়।
শুধু ভেটো নয়, গোটা ব্যবস্থার সংস্কার চাই
ভারতের বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারকে কেবল ভেটো ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সদস্যসংখ্যা, স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যের শ্রেণিবিন্যাস, বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব এবং পরিষদের কাজের পদ্ধতি—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন প্রয়োজন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা একুশ শতকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে আর যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে নয়াদিল্লি। ভারতের মতে, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা কঠিন।
পার্বতানেনি দ্রুত লিখিত প্রস্তাবভিত্তিক আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও লক্ষ্য স্থির করা জরুরি। আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়ার ১৭টি পর্ব পেরিয়েও দৃশ্যমান ফল না আসায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
ভেটো নিয়ে ভারতের আপত্তি কোথায়?
ভারত ভেটো ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের পক্ষেও নয়। পার্বতানেনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ভেটো অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এই ক্ষমতার ব্যবহার করা অনুচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি ‘কার্যত ভেটো’ বা এমন এক ধরনের বাধার কথা তুলে ধরেন, যা সব সময় আনুষ্ঠানিক ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রয়োগ হয় না। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি-সংক্রান্ত বিবৃতি, সংবাদমাধ্যমের জন্য বিবৃতি কিংবা নিষেধাজ্ঞা কমিটির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ঐকমত্যের অলিখিত নিয়মের সুযোগ নিয়ে কোনও একটি সদস্য প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। এতে আনুষ্ঠানিক ভেটো না থাকলেও সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়াতেও ঐকমত্যের শর্ত সংস্কারের পথে বাধা হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ ভারতের। নয়াদিল্লির মতে, আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বাধিক রাজনৈতিক সমর্থন অর্জন করা; প্রতিটি বিষয়ে সর্বসম্মতি বাধ্যতামূলক করে দিলে অগ্রগতি আটকে যেতে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনের দাবিতে ভারত
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরব ভারত। একই সঙ্গে ২০২৮-২৯ মেয়াদের জন্য অস্থায়ী সদস্যপদও চাইছে নয়াদিল্লি। ওই মেয়াদের নির্বাচনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত একটি আসনে ভারত ও তাজিকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা; নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছরের জুনে।
ভারত সর্বশেষ ২০২১-২২ সালে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ছিল। এর আগে ১৯৫০-৫১, ১৯৬৭-৬৮, ১৯৭২-৭৩, ১৯৭৭-৭৮, ১৯৮৪-৮৫, ১৯৯১-৯২ এবং ২০১১-১২ সালেও পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করেছে দেশটি।
ভারতের বক্তব্য, ভেটো ক্ষমতা নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করলেই নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্বাসযোগ্যতা, বৈধতা ও কার্যকারিতা ফিরে আসবে না। এর জন্য এমন একটি কাঠামো দরকার, যা বর্তমান বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য ও আঞ্চলিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করবে। আট দশক আগের যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিষদকে বদলানোই এখন আন্তর্জাতিক সংস্কার আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন—এমনটাই জানিয়েছে নয়াদিল্লি।


