আইআইটি খড়্গপুরের একদল গবেষক আর্থিক বিকাশের সঙ্গে জলবাহিত অসুখের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের মিশ্রণ কমানোর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
আইআইটি খড়্গপুরের একদল গবেষক আর্থিক বিকাশের সঙ্গে জলবাহিত অসুখের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের মিশ্রণ কমানোর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিগত ৩২ বছরে দেশে ডায়রিয়ার মতো জলবাহিত অসুখের কারণে প্রায় ১৫.৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সমীক্ষায় আরও প্রকাশ, দেশের গ্রামাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের মিশ্রণ বেড়েছে। তবে, ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত কিছু কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলে দূষণের পরিমাণ লক্ষ্যণীয় হারে কমেছে বলে জানা গেছে।
ভারতকে বাদ দিয়ে যদি অবশিষ্ট বিশ্বের দিকে নজর দেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সঠিক ধারণাই নেই। এমনকি, ১০০ কোটি মানুষ এখনও প্রকাশ্য স্থানে শৌচকর্ম করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়েও ভারতে ৫০ কোটির বেশি মানুষ প্রকাশ্য স্থানে শৌচকর্ম করতেন। এর ফলে, সংশ্লিষ্ট এলাকার জলের উৎসগুলি বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণে এসে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হত এবং এর গুরুতর প্রভাব পড়ত পরিবেশগত এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। আইআইটি খড়্গপুরের স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিপার্টমেন্ট অফ জিওলজি অ্যান্ড জিওফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি পরিচালিত সমীক্ষায় এই সমস্ত তথ্য উঠে এসেছে।
অবশ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সারা ভারতে সুস্থায়ী উন্নয়নের উদ্দেশ্যগুলি অর্জনে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে স্বচ্ছ ভারত অভিযান রূপায়িত হচ্ছে। তবে, ভূগর্ভস্থ জল তথা মানুষের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এই অভিযানের প্রভাব এখনও নিরূপণ করা হয়নি। এই প্রথমবার গবেষকরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জলে বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণের বিষয়টি এবং মানব দেহে ডায়রিয়ার মতো ঘটনার সঙ্গে এর প্রভাবের দিকটি জানার চেষ্টা করেছেন। সমীক্ষায় বিগত তিন দশক ধরে সারা ভারত জুড়ে ভূগর্ভস্থ জলের গুণমানে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিষয়টি নিরূপণের চেষ্টা হয়েছে।
দেশের গড় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বা অন্যান্য আর্থিক অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্যের বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি নিরূপণের বিষয়টিও এই সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, সমীক্ষায় ১৯৯২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কাছ থেকে প্রাপ্ত উপগ্রহ-ভিত্তিক ‘নাইটলাইট’ তথ্য কাজে লাগানো হয়েছে। এই তথ্যকে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে কাজে লাগানো হয়েছে এবং যোগসূত্র গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সঠিক স্বাস্থ্যবিধান এবং আর্থিক অগ্রগতির বিষয়গুলি মনুষ্য স্বাস্থ্য, নিম্নমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, উন্মুক্ত স্থানে শৌচকর্মের মতো আচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও বলা হয়েছে, সুঅভ্যাস মেনে চলতে পারলে জলবাহিত রোগের বোঝা কমানো সম্ভব।
জলের গুণমান এবং জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মানোন্নয়নে উপরোক্ত সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা হয়েছে আর্থিক উন্নয়নের সঙ্গে এই তথ্যের কি সম্পর্ক রয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, ২০১৪ সাল থেকে জলের গুণমান এবং মনুষ্য স্বাস্থ্যক্ষেত্রে তুলনামূলক অগ্রগতি হয়েছে। তবে, সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত পানীয় জলের ভূগর্ভস্ত উৎস গড়ে তোলা এখনও সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুখার্জি জানিয়েছেন, ভূগর্ভস্থ জল সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত কিনা তা পর্যালোচনার জন্য আরও বেশি তথ্যের প্রয়োজন। তথাপি, জলের গুণমান খারাপ এমন এলাকাগুলিতে মানুষের কু-অভ্যাসের ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্যক্ষেত্রের মানেও ক্রমাবনতি ঘটছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যাপক জনবহুল এলাকাগুলিতে জলের গুণমান হ্রাস পেয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও বস্তিজনিত সমস্যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারতের মতো দেশে সাধারণ মানুষের জীবনে এই দুটি বিষয়ের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তথাপি, বিগত তিন দশকে বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণ প্রায় ৩.০৯ শতাংশ এবং ডায়রিয়ার ঘটনা প্রতি বছর ২.৬৯ শতাংশ হারে কমেছে। ভারতের অধিকাংশ এলাকাতেই ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণ এবং এর ফলে জটিল ডায়রিয়ায় আক্রান্তের ঘটনা কমেছে। এটা সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, শহরাঞ্চলের বিকাশ এবং ভূমির ব্যবহারে পরিবর্তন আনার দরুণ। গবেষকরা সমীক্ষায় মত প্রকাশ করেছেন, সামাজিক আচার-আচরণ, বিভিন্ন ধরনের কু-অভ্যাস, ব্যবহার ও অপব্যবহার তথা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মতো বিষয়গুলির সঙ্গে নিরক্ষতার সম্পর্ক রয়েছে। পক্ষান্তরে সচেতনতার অভাব বেড়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা এবং এর প্রভাব পড়েছে ভূগর্ভস্থ জলে বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণের।


