চায়না লাইটের দাপটে কোণঠাসা মাটির প্রদীপ

3 - মিনিট |

চায়না লাইটের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার মাটির প্রদীপ। চায়না লাইটের রাসায়নিক বিক্রিয়া শরীরে ক্ষতিকর জেনেও মানুষ অপেক্ষাকৃত সস্তার কারনে চায়না লাইটকে বেছে নিচ্ছেন ।

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

চায়না লাইটের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার মাটির প্রদীপ। চায়না লাইটের রাসায়নিক বিক্রিয়া শরীরে ক্ষতিকর জেনেও মানুষ অপেক্ষাকৃত সস্তার কারনে চায়না লাইটকে বেছে নিচ্ছেন ।

একসময় মাটির প্রদীপের আলোয় দীপাবলীর সন্ধ্যা ভরে উঠতো  সমস্ত বাড়ী । ফলে কুমোরপাড়ায় মাটির প্রদীপ কেনার জন্য হিড়িক পড়ে যেত । কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ  চিনা আলোর রকমারি বাতিতে বাজার ছেয়ে গেছে। বাহারি এইসব আলোর দাপটে কুমোর পাড়া কোণঠাসা । হাতে গোনা কয়েক দিন বাদে বাঙালির আরেকবার পার্বণ দীপাবলি । এই দীপাবলি উৎসবেও এখনো পর্যন্ত মাটির প্রদীপের সেভাবে যে চাহিদা নেই তা বাঁকুড়া শহর ও উত্তর বাঁকুড়ার শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেল। উল্টে বিদ্যুতের প্লাগ লাগানো চায়না প্রদীপ, ঘূর্ণায়মান রকমারি রং খেলনো ঝাড়বাতি, টুনি বাল্ব লাগানো চেন বাতি কেনার ভিড় দোকানে দোকানে। 

কয়েকবছর আগেও বর্ষার পর থেকেই বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন গ্রামের কুমোরপাড়ায় ঢুকলেই দেখা যেত চূড়ান্ত ব্যস্ততা । পরিবারের সকলেই  ভোরের আলো ফোটা থেকে শুরু করে সূর্য ডোবা না পর্যন্ত থাকতো প্রদীপ তৈরীতে । কালীপূজা দীপাবলীতে যে ব্যাপক চাহিদা হোত প্রদীপের । সারা কুমোরপাড়ায় শোরগোল পড়ে যেত  কার বাড়িতে কত মাটির প্রদীপ কেনার বরাত পড়ল । কোন গ্রামে পাইকারদের ভিড় বেশি এই নিয়েও চলত অদৃশ্য প্রতিযোগিতা । কিন্তু এখন দুর্গা পুজোর পর থেকে জেলার কুমোরপাড়া গুলিতে  শুনশান অবস্থা।

মৃৎশিল্পী ও ক্রেতাদের একাংশের দাবি, “কার্যত এইসব চায়না আলোর দাম কম এবং এই কম খরচে অনেক বেশি উজ্জ্বল আলো পাওয়া যাচ্ছে । এছাড়াও মাটির প্রদীপ জ্বালানোর হ্যাপা অনেক। পাশাপাশি চায়না আলো যতক্ষণ খুশি জ্বালিয়ে রাখা যায় । দূর থেকে বাড়িটাকেও রঙিন মনে হয়। তাই মানুষ চায়না আলোর প্রতি বেশি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন । তাই কষ্ট করে মাটির প্রদীপ তৈরি করেও তা বিক্রির জন্য হা-পিত্যেশ করে থাকতে হচ্ছে।”

বাঁকুড়া ২ নম্বর ব্লকের সেন্দড়া গ্রামের কুমোরপাড়া মাটির হাঁড়ি- কলসি, পুজোর ঘট, প্রদীপ ইত্যাদি মৃৎশিল্পের  জন্য বিখ্যাত। গ্রামের মৃৎশিল্পী গুইরাম কুম্ভকারের আক্ষেপ, “কয়েক বছর আগেও দুর্গা পুজোর পর থেকে পরিবারের সকলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত থাকতাম । কিন্তু এবার চাহিদা না থাকায় মাত্র হাজার দুয়েক প্রদীপ তৈরি করেছি।”

গ্রামের আরেক মৃৎশিল্পী অজয় পাল বলেন, “এইসব মাটির জিনিস তৈরি করতে আলাদা মাটির প্রয়োজন । এখন সেই মাটি পাওয়াও দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে । প্রদীপের চাহিদা না থাকায় থাকলেও মাটির তৈরি চায়ের ভাঁড়ের চাহিদা বাড়ছে । প্লাস্টিক বর্জনের সচেতনতা থেকেই এটা সম্ভব হয়েছে । পরিবেশবিদদের মতে প্লাস্টিক বর্জন করে চায়ের ভাঁড়ের চাহিদা বাড়ছে সেটা আশার কথা । কিন্তু যেভাবে চায়না বাতিবাজার ছেয়েছে তাতে এই সব বর্জ্য গুলি অচিরেই আমাদের পক্ষে একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে । তাই এর বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে । মাটির প্রদীপের চাহিদা না থাকলেও মাটির তৈরি চায়ের ভাঁড়, মাটির ঘট এসবের বিক্রি বাটা ভালোই হয়েছে দুর্গা পুজোর  সময় বলে জানালেন মৃৎশিল্পীরা। তবে আগে যেমন ১৫ থেকে ২০ হাজার মাটির প্রদীপ বিক্রি করতেন এক একজন মৃৎশিল্পী গত কয়েক বছরে মোমবাতি আর চায়না আলোয় তাদের সেই বাজার কেড়ে নিয়েছে | তাছাড়াও মাটির প্রদীপের দাম পাওয়া যায়না । ছোট প্রদীপের দাম শতকরা  ৬০ থেকে ৭০ টাকা । মাঝারি সাইজের দাম শতকরা ১১৫ থেকে ১২৫ টাকা । আর বড় প্রদীপের দাম ১০০ টিতে পাওয়া যায় ৪০০ টাকা । এখন সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ১০০ টাকা রোজগার করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে । তাই অনেকেই এই কারবার ছেড়ে দিয়ে  অন্য কাজের সন্ধান করছেন ।” মেজিয়া শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ী বাচ্চু গোস্বামী এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতা পরেশ চট্টরাজদের মতে, চায়না আলো কিনলে খরচের পাশাপাশি ঝামেলাও কম । কিন্তু  চায়না আলোর আগ্রাসন আটকাতে  না পারলে অচিরেই  মাটির প্রদীপের চাহিদা বলতেই থাকবে না । হারিয়ে যাবে বাংলার অন্যতম কুটির শিল্প ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *