কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে নতুন দিশা, নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইআইটি বম্বের গবেষকদের প্রস্তাবিত বিশেষ জালক

2 - মিনিট |

চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে ইলেকট্রনের অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা, ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম সেন্সর ও উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে কাজে লাগতে পারে গবেষণা

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

গুয়াহাটি:কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও উন্নত উপাদান বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিলেন নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইআইটি বম্বের গবেষকেরা। দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এমন একটি দ্বিমাত্রিক জালক কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছেন, যার সাহায্যে চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে ইলেকট্রনের অস্বাভাবিক কোয়ান্টাম অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে এই গবেষণা উন্নত কোয়ান্টাম সেন্সর, নিয়ন্ত্রণযোগ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র এবং নতুন ধরনের উপাদান তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।

গবেষণায় প্রস্তাবিত কাঠামোটির নাম ‘ডায়মন্ড-ডোডেকাগন জালক’। কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই বিশেষ জ্যামিতিক বিন্যাসে ইলেকট্রনগুলি ক্ষুদ্র অঞ্চলের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে। এর ফলে তিনটি সমতল শক্তিস্তর বা ‘ফ্ল্যাট এনার্জি ব্যান্ড’ তৈরি হয়।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এই ধরনের শক্তিস্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফ্ল্যাট ব্যান্ডে ইলেকট্রনের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত থাকে। এর ফলে ইলেকট্রনগুলির পারস্পরিক ক্রিয়ার প্রভাব আরও জোরালো হতে পারে এবং এমন কিছু কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি হতে পারে, যা সাধারণ উপাদানে সহজে দেখা যায় না।

নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিপ্লব পালের নেতৃত্বে এই গবেষণা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আইআইটি বম্বের গবেষক জয়দীপ মাঝি। গবেষকদের মতে, জালকের জ্যামিতিক বিন্যাস বদলে ইলেকট্রনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, সেটিই এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

চৌম্বক ক্ষেত্রেই বদলাতে পারে কোয়ান্টাম অবস্থা

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে জালকের মধ্যে ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম অবস্থা বদলে যেতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তন ‘টপোলজিক্যাল ফেজ ট্রানজিশন’ বা টপোলজিক্যাল দশান্তর ঘটাতে পারে।

এই অবস্থায় কোনও উপাদানের অভ্যন্তর বিদ্যুৎ পরিবহণের ক্ষেত্রে অন্তরকের মতো আচরণ করলেও তার প্রান্ত বরাবর বিদ্যুৎ প্রবাহ চলতে পারে। এই প্রান্তীয় অবস্থাগুলি উপাদানের কিছু ধরনের ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতার প্রভাবের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে।

এ কারণে প্রস্তাবিত জালকটি ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক পরিবহণ, কোয়ান্টাম তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং উন্নত উপাদান তৈরির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইআইটি বম্বের ধাতুবিদ্যা ও উপাদান বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন পোস্টডক্টরাল গবেষক জয়দীপ মাঝি ব্যাখ্যা করেছেন, বিশেষভাবে নকশা করা কাঠামোয় ইলেকট্রনের চলাচলের বিভিন্ন পথের মধ্যে এমন পারস্পরিক ব্যতিচার ঘটতে পারে, যাতে ইলেকট্রন অবাধে চলার বদলে একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে আটকে যায়। এই বৈশিষ্ট্যই ফ্ল্যাট ব্যান্ড তৈরির অন্যতম ভিত্তি।

সুপারকন্ডাক্টিভিটি নিয়ে সম্ভাবনা, তবে আরও গবেষণা জরুরি

ফ্ল্যাট ব্যান্ড নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ, ইলেকট্রনের চলাচল সীমিত হলে তাদের পারস্পরিক ক্রিয়ার প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে নতুন ধরনের চৌম্বক অবস্থা কিংবা সুপারকন্ডাক্টিভিটির মতো বিশেষ কোয়ান্টাম দশা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। তবে প্রস্তাবিত জালকে এমন অবস্থাগুলি বাস্তবে তৈরি হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জগদীশ কুমার পট্টনায়েক এই গবেষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের আন্তর্বিষয়ক গবেষণা কোয়ান্টাম উপাদান ও উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের গবেষণাগত সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

গবেষণাটি জার্নাল অফ ফিজিক্স: কনডেন্সড ম্যাটার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনর স্টার্ট-আপ রিসার্চ গ্রান্টের অর্থায়নে কাজটি সম্পন্ন হয়।

তবে গবেষণাটি এখনও তাত্ত্বিক এবং কম্পিউটার সিমুলেশন-নির্ভর। প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবে তৈরি করে পূর্বাভাস দেওয়া কোয়ান্টাম অবস্থাগুলি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব কি না, সেটিই পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। ফোটোনিক জালক এবং অতি-শীতল পরমাণুর ব্যবস্থা ব্যবহার করে গবেষণার ফলাফল পরীক্ষার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষকেরা মনে করছেন, পরীক্ষাগারে এই ফলাফল যাচাই করা গেলে কোয়ান্টাম পদার্থের আচরণ নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। তবে ব্যবহারিক প্রযুক্তিতে পৌঁছতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *