খাদ্য নিরাপত্তা থেকে কৃষকের সমৃদ্ধি: ২০৪৭-এর উন্নত ভারতের ভিত্তি গড়বে কৃষি

6 - মিনিট |

সবুজ বিপ্লব ভারতকে খাদ্যশস্যে স্বনির্ভরতার পথ দেখিয়েছিল। এবার লক্ষ্য পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্ববাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করা। প্রযুক্তি, গবেষণা, পরিকাঠামো ও বাজারের সমন্বয়ে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক করে তোলাই উন্নত ভারতের অন্যতম প্রধান শর্ত।

KRC Times Desk

শিবরাজ সিং চৌহান

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষি ও কৃষককল্যাণকে দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। ২০১৫ সাল থেকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি কৃষিক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত পরিবর্তনের লক্ষ্যে এগিয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা কৃষকের আয় বাড়ানোর মধ্যেই এই পরিবর্তন সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন এক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যা উৎপাদনশীল, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই।

প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, উন্নত ভারত গড়তে হলে ভারতীয় কৃষিকেও উন্নত করতে হবে। দেশের খাদ্যের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যও তিনি সামনে রেখেছেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ’ এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর ‘জয় বিজ্ঞান’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘জয় অনুসন্ধান’—গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান। কৃষির ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং নতুন জ্ঞানের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই দৃষ্টিভঙ্গি তারই প্রতিফলন।

খাদ্য নিরাপত্তার পর এবার পুষ্টি ও কৃষকের সমৃদ্ধি

ভারতের কৃষির ইতিহাসে সবুজ বিপ্লব এক যুগান্তকারী অধ্যায়। একসময় খাদ্যশস্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশ কয়েক দশকের মধ্যে প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করে। উন্নত বীজ, সেচ, কৃষি পরিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা এই পরিবর্তনের ভিত গড়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একসঙ্গে কাজ করলে যে বড় পরিবর্তন সম্ভব, সবুজ বিপ্লব তার প্রমাণ।

কিন্তু কৃষির অগ্রাধিকার চিরকাল একই থাকতে পারে না। কৃষকের প্রত্যাশা বদলেছে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে, বাজারের চাহিদা নতুন রূপ নিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ।

তাই আজকের লক্ষ্য শুধু আরও বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন নয়। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের সমৃদ্ধি, জল ও মাটির সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। অর্থাৎ, কতটা উৎপাদন করা গেল, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কতটা দক্ষতার সঙ্গে, কত কম সম্পদ ব্যবহার করে এবং কতটা লাভজনকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব।

এক দশকে কৃষির বিকাশে নতুন গতি

১৯৯৫-৯৬ এবং ২০১৪-১৫ সালকে ভারতীয় কৃষির বিকাশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাজারের সঙ্গে কৃষির সংযোগ বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি কমে আসার মতো বিষয়গুলি প্রভাব ফেলেছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেচের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যবস্থা, বাজার সংস্কার, কৃষির বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়ার ফলে কৃষির বিকাশে নতুন দিশা তৈরি হয়েছে।

প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে কৃষির গড় বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২.৭ শতাংশ। ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হয়। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার পৌঁছেছে প্রায় ৪.৫ শতাংশে।

সাম্প্রতিক দুই বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্য বলে দাবি করা হয়েছে। এই সময়ে বার্ষিক উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ ২২.১ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, যা আগের পর্যায়ের তুলনায় অনেক বেশি। কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়, বিভিন্ন প্রকল্পের সংযুক্ত প্রয়োগ, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ এবং কৃষকদের সহায়তা এই অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কৃষির বহুমুখীকরণ। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ফল, সবজি, দুগ্ধ, মৎস্য, পোলট্রি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের গুরুত্ব বেড়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করতে এই ক্ষেত্রগুলির বিকাশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস, বদলাতে হবে চাষের ধরন

ভারতের কৃষিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ১৯৭২-৭৩ সালে গ্রামীণ ভারতে খাদ্যব্যয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যয় হত খাদ্যশস্যের পেছনে। ২০২২-২৩ সালে সেই অংশ কমে প্রায় ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ফল, সবজি, ডিম, মাংস এবং মাছের পেছনে ব্যয়ের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। শহরাঞ্চলেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।

এই প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, কৃষি উৎপাদনের পরিকল্পনায় পুষ্টির চাহিদাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ডাল, তৈলবীজ, ফল, সবজি, দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও পোলট্রির উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষককে শুধু কাঁচা পণ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পণ্য বাছাই, মান নির্ধারণ, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, পরিবহণ এবং রফতানির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কৃষিকে।

কৃষিপণ্যের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ে তৈরি হয়। সেই মূল্য সংযোজনের বড় অংশ যদি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধরে রাখা যায়, তবে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামে নতুন উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

কৃষককেন্দ্রিক ব্যবস্থার ভিত

কৃষির এই রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক প্রকল্প চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা জল ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। মাটির স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে মাটির গুণমান পরীক্ষা এবং সুষম সার প্রয়োগে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিষাণ উর্জা সুরক্ষা এবং উত্তান মহাভিযান—পিএম-কুসুম—কৃষির সঙ্গে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে।

কৃষক উৎপাদক সংগঠন বা এফপিও কৃষকদের একত্রিত করে তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। ই-ন্যাশনাল এগ্রিকালচার মার্কেট বা ই-ন্যাম ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিবাজারের সংযোগ শক্তিশালী করছে। কৃষি পরিকাঠামো তহবিল, প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্পদ যোজনা এবং ক্ষুদ্র খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিকীকরণ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ ফসল তোলার পর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।

এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগগুলিকে একটি সমন্বিত কৃষককেন্দ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা—বীজ থেকে মাটি, খেত থেকে বাজার এবং গবেষণাগার থেকে জীবিকার মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা। প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; কৃষক কতটা সহজে পরিষেবা পাচ্ছেন, উৎপাদনের খরচ কতটা কমছে এবং বিক্রির সময় কতটা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন, তার ওপর সাফল্য নির্ভর করবে।

কৃষিতে গবেষণা ও প্রযুক্তির নতুন ভূমিকা

কৃষি গবেষণার লক্ষ্যও বদলাচ্ছে। আগে প্রধান গুরুত্ব ছিল উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সহনশীলতা, পুষ্টিগুণ, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং রোগ-পোকার মোকাবিলা।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১,৫৪০টি ফসলের নতুন জাত প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩,২৩৬ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বহু জাত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি, ফসলের পুষ্টিগুণ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহচিত্র, ড্রোন, জিনগত গবেষণা, জীবপ্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক তথ্যপ্রযুক্তি কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। কখন বীজ বপন করতে হবে, কতটা সেচ দিতে হবে, কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, কোথায় রোগ-পোকার আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে এবং কোন বাজারে ভালো দাম পাওয়া যেতে পারে—এসব বিষয়ে দ্রুত ও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব।

ডিজিটাল কৃষি উদ্যোগ, অ্যাগ্রিস্ট্যাক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরামর্শ পরিষেবা কৃষকের কাছে তথ্য ও সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সহজবোধ্য, সাশ্রয়ী এবং স্থানীয় পরিস্থিতির উপযোগী হবে। প্রযুক্তির সুফল যেন শুধু বড় কৃষক বা উন্নত পরিকাঠামো থাকা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

গবেষণাগার থেকে খেত পর্যন্ত

কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগের সুফল তখনই সর্বাধিক হয়, যখন সেই গবেষণার ফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, গবেষণাগার, নতুন উদ্যোগ এবং বেসরকারি উদ্ভাবকদের সঙ্গে কৃষকের সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বাস্তব চাষের সঙ্গে যুক্ত করা এই পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কাজ।

একই সঙ্গে ভারতের কৃষিকে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমে যাওয়া, মাটির অবক্ষয়, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি করছে। অনির্দিষ্টকাল ধরে জল, সার, শক্তি ও জমির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির পথ অনুসরণ করা সম্ভব নয়।

তাই প্রতি একক জল, পুষ্টি উপাদান এবং শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে জল ও সার সাশ্রয়ী ফসলের জাত, মাটির জৈব গুণমান বৃদ্ধি, সমন্বিত রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণমূলক কৃষি এবং নির্ভুল চাষপদ্ধতির ওপর।

ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোও বিশেষ প্রয়োজন। এই দুই ক্ষেত্রের অগ্রগতি পুষ্টি নিরাপত্তার পাশাপাশি ভোজ্যতেল ও ডালের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। কৃষকের উৎপাদন খরচ, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব রয়েছে।

টেকসই কৃষি তাই কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি কৃষকের আয়, উৎপাদনের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

খেতের উৎপাদন থেকে বিশ্ববাজার

কৃষক দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করলেও যদি লাভজনক দামে পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তবে কৃষির সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণাগার, হিমঘর, পরিবহণ, মান নির্ধারণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং ডিজিটাল বাজারের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে ফল, সবজি, দুধ ও মাছের মতো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন পণ্যের ক্ষেত্রে সময়মতো বাজারে পৌঁছনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণ ও পরিবহণের ঘাটতি কমানো গেলে ফসল নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমবে এবং কৃষক আরও ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কৃষক উৎপাদক সংগঠন, সমবায় এবং অন্যান্য কৃষক সমষ্টি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একসঙ্গে পণ্য সংগ্রহ, মান বজায় রাখা এবং বড় ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে তারা কৃষকের বাজারে প্রবেশের বাধা কমাতে পারে।

ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক বাজারে এমন কৃষিপণ্য সরবরাহ করা, যার গুণমান, খাদ্য নিরাপত্তা, উৎপত্তির পরিচয় এবং ব্র্যান্ডের ওপর ক্রেতাদের আস্থা থাকবে। শুধু দেশীয় বাজারে বিক্রি নয়, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে কৃষকদের যুক্ত করতে হবে। এতে গ্রামীণ উদ্যোগ, কর্মসংস্থান এবং রফতানির সুযোগ বাড়বে। কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের বড় অংশও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ই সাফল্যের চাবিকাঠি

কৃষির এই রূপান্তর শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কৃষি একটি যৌথ জাতীয় দায়িত্ব। রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষক সংগঠন, সমবায়, বেসরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ভারতের কৃষির বৈচিত্র্যও এই সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায়। এক রাজ্যের কৃষি সমস্যা অন্য রাজ্যের থেকে আলাদা হতে পারে। কোথাও সেচের অভাব, কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি, কোথাও মাটির গুণমানের সমস্যা, আবার কোথাও বাজার ও পরিবহণের দুর্বলতা কৃষকের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই জাতীয় লক্ষ্য এক হলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

কৃষি, জল, শক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পুষ্টি, জলবায়ু, বাণিজ্য এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে আলাদা আলাদা ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এই ক্ষেত্রগুলির মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে পারলেই কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব।

২০৪৭-এর ভারতের কেন্দ্রে থাকুন কৃষক

উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে কি না, তা শুধু কত টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হল, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা যাবে না। কৃষকের জীবনযাত্রার মান, তাঁর আয়, উৎপাদনের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সমৃদ্ধ কৃষকই সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। জলবায়ুর ধাক্কা সামলাতে সক্ষম কৃষিব্যবস্থা খাদ্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। আর প্রতিযোগিতামূলক কৃষিপণ্য ও মূল্য সংযোজনের শৃঙ্খল ভারতকে বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান নিতে সাহায্য করে।

সবুজ বিপ্লব ভারতের খাদ্য ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার পথ তৈরি করেছিল। পরবর্তী কৃষি রূপান্তরের লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষকের সমৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্ববাজারে ভারতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

প্রধানমন্ত্রীর সামনে রাখা উন্নত ভারতের স্বপ্নে কৃষিকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার যে দিশা রয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, পরিকাঠামো, বাজার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তার কেন্দ্রে থাকতে হবে কৃষককে।

২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার পথে কৃষক যেন শুধু সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে না থাকেন। দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁকে সক্রিয় অংশীদার এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃষির আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে এই পরিবর্তনের ওপরই।

লেখক শিবরাজ সিং চৌহান, কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষককল্যাণ এবং গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী, ভারত সরকার। নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *