চলতি মাসেই দ্বিতীয় দফায় ১,০০০ কোটি টাকা ঋণের উদ্যোগ; অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৯ বছরের জন্য সরকারি বন্ডের বিনিময়ে ঋণ নেবে রাজ্য। অসমের মোট ঋণের বোঝা ২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি।
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
গুয়াহাটি: রাজ্যের ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত। আগামী ২৭ অক্টোবর ফের ১,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিতে চলেছে অসম সরকার। রাজ্য অর্থ দফতরের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৯ বছরের মেয়াদের সরকারি বন্ডের বিনিময়ে এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে। এর আগে চলতি মাসের ১৩ অক্টোবরও ১,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল রাজ্য সরকার। ফলে এক মাসের মধ্যেই ফের বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে ২৭ অক্টোবর ঋণ সংগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে রাজ্য সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সেই অর্থের ব্যবহার, রাজস্ব আদায় এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা জরুরি।
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক দফায় ঋণ নিয়েছে অসম সরকার। ১২ মে ১,০০০ কোটি টাকা এবং ২৬ মে ৭৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। জুনে ১৬ ও ৩০ তারিখে ১,০০০ কোটি টাকা করে ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২১ জুনের একটি ঋণের কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে, যদিও ওই তারিখের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এর পর ৪ ও ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ১,০০০ কোটি টাকা করে ঋণের উল্লেখ রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর দুই দফায় মোট ১,৩০০ কোটি টাকা এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চলতি মাসের ১৩ অক্টোবর আরও ১,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পর ২৭ অক্টোবরের প্রস্তাবিত ঋণ যুক্ত হলে এই তালিকায় নতুন করে ১,০০০ কোটি টাকা যোগ হবে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবরের ঋণ-সহ মে মাস থেকে এই তালিকায় মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১১,৮৫০ কোটি টাকা। তবে এটি উল্লিখিত নির্দিষ্ট ঋণগুলির যোগফল; রাজ্যের সামগ্রিক ঋণের হিসাবের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
রাজ্যের মোট ঋণ কত?
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অসমের মোট ঋণের বোঝা বর্তমানে ২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং জনপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪২,৫০০ টাকা। গত পাঁচ বছরে রাজ্য সরকার প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে রাজ্যের আর্থিক পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যয়, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক খরচ মেটাতে ঋণের উপর নির্ভরতা কতটা বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঋণ থেকে সংগৃহীত অর্থ কতটা উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা কতটা, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মার্চে অসমের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১,৯৬৪ কোটি টাকা। সর্বানন্দ সোনোয়ালের সরকারের সময় তা বেড়ে ৮৯,৭০৯ কোটি টাকায় পৌঁছয়। পরবর্তী সময়ে ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২৫ সালের মার্চে রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝা ১,৭৭,৯৮৩ কোটি টাকা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব পরীক্ষকের (ক্যাগ) প্রতিবেদন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে ঋণের প্রকৃত বর্তমান পরিমাণ, রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত, সুদ পরিশোধের খরচ এবং রাজস্ব ঘাটতির সর্বশেষ তথ্য যাচাই না করে রাজ্যের আর্থিক স্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
২৭ অক্টোবরের প্রস্তাবিত ১,০০০ কোটি টাকার ঋণ সেই বৃহত্তর আর্থিক বিতর্ককে ফের সামনে আনছে। রাজ্যের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঋণ পরিশোধের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।


