বাংলাদেশ | নির্বাচনী কৌশলে জামায়াতকে মাঠে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ

4 - মিনিট |

নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি যদি তৎপর নাও হয়, সেখানে জামায়াতে ইসলাম মাঠে থাকলে জনগণের মধ্যেও একটি প্রভাব পড়বে

সমীরণ রায়

বাংলাদেশ : আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী কৌশল হিসেবে জামায়াতে ইসলামকে মাঠে রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। সূত্র বলছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করে। এরপর প্রায় দশ বছর পার হলেও আপিলের ওপর এখনও শুনানি হয়নি।

এমনই প্রেক্ষাপটে গত ১০ জুন রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দেয় সরকার। এতে করে জামায়াতের সমাবেশের অনুমতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। দলীয় সূত্র বলছে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে চাপে রাখতেই জামায়াতে ইসলামকে মাঠে নামানোর কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। কারণ দেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

এখানে ভোটের হিসেবেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেই হিসেব করা হয়। এরমধ্যে বিএনপির ভোটের অঙ্কে জামায়াতে ইসলামীর একটি বড় অংশ রয়েছে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি যদি তৎপর নাও হয়, সেখানে জামায়াতে ইসলাম মাঠে থাকলে জনগণের মধ্যেও একটি প্রভাব পড়বে। তাছাড়া বিএনপির ভোটের বড় অংশ যদি জামায়াতে ইসলাম নির্বাচনী মাঠে থাকে তাহলে বল আওয়ামী লীগের কোটে থাকবে।

এতে করে বএনপির অবস্থান এমনিতেই নড়বরে হয়ে যাবে। এই উদ্দেশ্যেই মূলত, জামায়াতে ইসলামকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না আসলে জামায়াতের নিবন্ধন বৈধতা আসতে পারে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী জামায়াতের ইসলামীর সমাবেশের পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। এরমধ্যে গত রোববার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, জামায়াতকে মাঠে নামানোর বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটি রাজনৈতিক ব্যাপার। এটা একটা পলিটিক্যাল ডিসিশন, এটি সময়ই আমাদের বলে দেবে। তারা রাজনৈতিক দল, হাইকোর্টের রায় ছিল সংবিধানের সঙ্গে তাদের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক, গ্রহণযোগ্য না।

এই প্রেক্ষিতেও তাদের তো অনেক সমর্থন আছে। এই পরিস্থিতির আলোকে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। একটু অপেক্ষা করলে, আরও দেখা যাবে কী হয়। অনেক সময় রাজনীতিতে আমরা অনেক পদক্ষেপ নেই, এটি নিতে হয়। একই সঙ্গে গত রোববার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, জামায়াতে ইসলাম যেহেতু নিষিদ্ধ দল নয়, তাই তাদের সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তারা যে বক্তব্য দিয়েছে, সেগুলো বিএনপিরও বক্তব্য।

২০১৪ সালে তারা যেভাবে নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে শত শত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছিল, সেটারই ইঙ্গিত তারা দিয়েছে। বিএনপি জোটের প্রধান শরিক জামায়াতকে দিয়ে তারা এই কথাগুলো বলিয়েছে। তাদেরকে সুযোগ দিলে তারা কী করতে পারে, সেটি তাদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে। গত রোববার রাজধানীর রাজারবাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ইনডোরে সমাবেশ করতে পারে। জামায়াতে ইসলামী ইনডোরে সমাবেশ করতে চেয়েছিল।

ডিএমপি কমিশনার যাচাই করে অনুমোদন দিয়েছে। অন্যান্য অনিবন্ধিত দল যেভাবে ইনডোরে সমাবেশের অনুমতি পায়, সেভাবেই অনুমতি দেয়া হয়েছে জামায়াতকে। তবে জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এদিকে, গতকাল রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক অনুষ্ঠানে দশবছর পর জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তাদেরকে অনুমতি দেওয়ার মালিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অতএব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করুন।

জামায়াত সংক্রান্ত আরেক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার করার জন্য যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। এ সংক্রান্ত আইনটি সংশোধনের জন্য কিছুদিনের মধ্যে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। তবে তারা বিচারে যতক্ষণ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে অপরাধী দল বলা যাবে না।

জামায়াতে ইসলামের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এরপর সংগঠনটির পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। এরপর প্রায় দশ বছর পার হলেও আপিলের ওপর এখনও শুনানি হয়নি। এই মুহুর্তে সরকার তাদের সমাবেশের অনুমতি দিলো এটিকে আওয়ামী লীগ কিভাবে দেখছে এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সরকার উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে। আসলে সরকারও দেখতে চায়, জামায়ত বিগত দিনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসছে কি না? তবে কেন তাদের অনুমতি দিল, সেটি সরকারই বলতে পারবে।

জামায়াতের মতো সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দলকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, জামায়াতে ইসলাম একটি সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল। তাদেরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি জানি না, কেন কি কারণে সরকার জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে।

এটি হয়তো দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু মূল ঘটনাটি আমি জানি না। তারা সমাবেশের অনুমতি পেয়ে যে ভাষায় কথা বলেছে, এটা তাদের আগের আচরণের মতোই। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে কথা উঠেছে, বাংলাদেশে কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। যেহেতু জামায়াতে ইসলাম একটি বৃহত জনগোষ্ঠী। সে কারণেই হয়তো জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে সরকার।

পাশাপাশি জামায়াত ইসলামীর কাছে প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখে। সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির যে কলঙ্ক তাদের আছে, সেটি যেন মোচন করে, তারা যাতে নিজেদে প্রমাণ করতে পারে আমরা সাম্প্রদায়িক নয়। এ কারণে হয়তো সরকার তাদের সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী দলের মতো অপশক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়াটা কোনভাবেই এই সুখকর নয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ জামায়াতে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ না হলেও তারা প্রকাশ্যে ছিল না।

তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, অগ্নিকাণ্ডসহ ধ্বংসাত্বক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই দলটিকে গত ১০ বছরে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমোদন দেয়নি সরকার। কিন্তু গত ১০ জুন এই দলটিকে ইনডোরে একটি সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে সরকার। কারণ নির্বাচনের আগে যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে না হয়, সে কারণেই তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া রাজনীতিতে যাতে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করে সে কারণে তাদের হয়তো অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আমরা পরিষ্কারভাবে জানি তারা মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী একটি দল। তারা বাংলাদেশ মানে না সার্বভৌমত্ব মানে না। তবে তাদেরকে কেন অনুমতি দেওয়া হয়েছে এটি ভালো বলতে পারবে, সরকারের যে সংস্থা অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু ইতিবাচক হোক আর নেতিবাচকভাবেই হোক তাদের সুযোগ দেওয়াটা সমীচীন হয়নি।

আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জামায়াতে ইসলামকে হয়তো সরকার সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান সহোযোগী অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, আসলে রাজনীতিক অঙ্গনে ভিন্নতা এসেছে। আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতায় আত্মীয়করণ রাজনীতি শুরু হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেভাবে রাজনীতিটা হওয়ার কথা ছিল সেটি হয়নি। জাতীয় সংসদে থাকলে এক ব্যবস্থা আর না থাকলে আরেকটি ব্যবস্থা। গত ১০ বছর যাবৎ আমরা দেখে আসছি, জামায়াতে ইসলামের ব্যাপারে কড়া অবস্থানে ছিল সরকার। জামায়েত ইসলাম একটি বড় সংগঠন। তাদের কিছু লোকজনও আছে। শুধু তাই নয় গত ১০ বছরে তারা প্রকাশ্যে না থাকলেও ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল।

কিন্তু সরকার রাজনৈতিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন ধরনের বাতাস বইছে এ কারণে জামায়াতকে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। আসলে সরকার আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সামলাতে গিয়ে জামাতকে সুযোগ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কৌশলগত কারণেই জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে সরকার।

তবে ২০১৩ সালের জামাতে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে যে রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। পরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করার পর এই দশ বছর যাবত সেটি ঝুলে আছে। সত্যিকার অর্থে আইনগতভাবে জামাতে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে এখন বিষয়টি সামনে আসতো না। এ কারণেই বিষয়টি এই পর্যন্ত গড়িয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *