বিএনপির এক দফা আন্দোলন মোকাবিলায় প্রস্তুত আওয়ামী লীগ

4 - মিনিট |

এসব কর্মসূচিকে কোনোভাবেই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি মানতে না রাজ ক্ষমতাসীনরা

সমীরণ রায়

বাংলাদেশ : সরকারের পদত্যাগ, বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ও নতুন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন করার এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল বিএনপি। দেশের এই বৃহত্তর বিরোধী দলের এক দফা আন্দোলন মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির এক দফা আন্দোলন মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন দলটিও বিভিন্ন কর্মসূচি নেবে। তবে এসব কর্মসূচি যাতে সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেই বিষয়টিও খেয়াল রাখবে আওয়ামী লীগ। এসব কর্মসূচিকে কোনোভাবেই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি মানতে না রাজ ক্ষমতাসীনরা। দলটি গণতান্ত্রিক পন্থায় শান্তির কর্মসূচি দেবে।

এরমধ্যে থাকবে শান্তি সমাবেশ, মানবন্ধন, সভা, সেমিনারসহ দিবস ভিত্তিক কর্মসূচি। সামনে আগস্ট মাস। তাই পুরো আগস্ট মাস জুরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৮তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে একের পর এক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে আওয়ামী লীগ, সহযোগি ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো।

ফলে বিএনপির এক দফা আন্দোলন মোকাবিলায় আর কোনো বেগ পেতে হবে না ক্ষমতাসীনদের। একই সঙ্গে জগণের জানমাল রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিএনপি-জামায়াত কোনো ক্ষতি করতে না পারে। সূত্র জানায়, বিএনপি যত কর্মসূচি হাতে নেবে, তাদের নেতাকর্মীদের নামে থাকা পুরোনো মামলাগুলো সচল করা হবে। কোনো কোনো মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা থাকবে।

পাশাপাশি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়ানো হবে, যাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপি আন্দোলন টেনে নিতে না পারে। এতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে বিএনপির ভেতরে ভাঙা গড়া শুরু হবে। এটিকে ত্রুপের তাস হিসেবে কাজে লাগাবে আওয়ামী লীগ। এছাড়া তাদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রয়েছে। পাশাপাশি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে যারা রয়েছে তারাও পিছু হটবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করার কথা ভাবছে দলের নীতিনির্ধারকরা।

সূত্র আরও জানায়, বিএনপি যেভাবে কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে তাদের কর্মীরা নিজেদের শক্তিশালী ভাবতে শুরু করবে। তারা বাধা উপেক্ষা করে পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়বে। এ অবস্থায় বিএনপির এক দফা আন্দোলন থামানোর উপায় ছাড়া বিকল্প কিছু ভাবছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বিএনপি রাজধানী ঢাকা ও এর বাইরে সমাবেশের নামে কোনো সহিংস কর্মকাণ্ড করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও প্রস্তুতি রয়েছে।

ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরে বিএনপির কর্মসূচি পালনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার ষড়যন্ত্র করলে এটা মেনে নেবে না। এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের কর্মসূচিগুলো কঠোর নজরদারিতে রাখবে আওয়ামী লীগ। কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা হলেই সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুতি রয়েছে দলটির নেতাকর্মীরা।

এদিকে, রোববার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপিসহ ৩৬ দলের এক দফা আন্দোলন তো এখনো শুরু হয়নি। শুরু হতে হতে কয় দল কেটে পড়ে, কয় দল শেষপর্যন্ত থাকে-সেটা দেখার বিষয়। এই ৩৬ দলের মধ্য এখন দরকষাকষি চলছে, আন্দোলন সফল হলে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে। এই আন্দোলেনর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাড়ায় সেটা দেখার বিষয়।

তবে রাজনীতির বিষয় রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। এতে সহিংসতার উপাদান যুক্ত হলে উদ্ভুত পরিস্থিতি বলে দেবে করণীয় কি হবে। জনগণের জানমাল রক্ষায় আমরা রাজপথে সতর্ক অবস্থানে আছি। নির্বাচন পর্যন্ত শান্তি সমাবেশ কর্মসূচি থাকবে।

অপরদিকে, রোববার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি যাই বলুক, তাদের মূল কৌশল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং নির্বাচন ভন্ডুলের অপচেষ্টা করা, যা মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে স্পষ্ট। তাদের এক দফার আন্দোলন মানে কিছুদিন পরপরই কৌশল পরিবর্তন। কোনো সময় তারা হাঁটা, কোনো সময় বসা কর্মসূচি দেয়।

এছাড়া রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, বিএনপির সরকারপতনের একদফা দাবি কথার কথা। তাদের কর্মসূচি সফল হতে পারে না। অনেক কথা বলা হয়, কার্যত কী হয় সেটি সবাই দেখে। যাদেরকে জনগণ পরিত্যাগ করেছে তারা কীভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করবে সেটা বোধগম্য নয়।

অবশ্য বিএনপি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটাতে পারে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর চড়াও হতে পারে, গাড়ি ভাঙচুর করতে পারে। এ ধরনের ঘটনা ঘটালে তারা জনবিচ্ছিন্ন হবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ, তারা সবসময় এটি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।

অপরদিকে, গত ২২ জনু আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। এরমধ্যে বিএনপি আন্দোলনে গেলে তা কিভাবে মোকাবিলা করা হবে, তারও কিছু গাইডলাইন দেন শেখ হাসিনা।

এরমধ্যে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তি বৃদ্ধিতে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অন্তর্গত থানা, ওয়ার্ড, ইউনিটগুলোকে বিএনপির আন্দোলন মোকবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকবে।

আর এই ষড়যন্ত্র রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এখন হার্ডলাইনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। একের পর এক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে হবে। এরমধ্যে শান্তি সমাবেশ, পদযাত্রা, মানববন্ধন, দিবস ভিত্তিক আলোচনা সভা চালিয়ে যেতে হবে। এসব কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের মূল কাজই হলো সন্ত্রাস করা। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাদভাঙা জবাব দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, বিএনপির আন্দোলন গত সাড়ে ১৪ বছর ধরে দেখে আসছি। এখন আর নতুন করে দেখার কিছু নেই। তবে বিএনপি সরকারের পদত্যাগ, বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ও নতুন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন করার এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। এর কোনো ভিত্তি নেই। তারা কখন কি নিয়ে আন্দোলন করে তা তারা নিজেরাই জানেন না।

তবে তারা যে ধরণের আন্দোলনই করুক না কেন, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগি এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো প্রস্তুত। তারা গণতান্ত্রিক পন্থায় কোনো কর্মসূচি পালন করলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কর্মসূচির নামে যদি কোনো সহিংসতা, সন্ত্রাস বা অগ্নি সংযোগের মতো কর্মসূচি দেয়, আমরাও রাজপথে তাদের মোকাবিলা করবে। তাদেরকে প্রতিহত করবো। তাদের আর ২০১৩-১৪ সালের মতো কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না।

দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে। ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা কোনো সহিংসতা করলে ব্যবস্থা নেবে। কারণ সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে কোনোভাবে দেশে বিশৃঙ্খলা করতে দেওয়া হবে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, বিএনপির এক দফা আন্দোলনটা কি সেটিই স্পষ্ট নয়। তারা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছে, সেটি তো আদালতেই মিমাংসা হয়ে গেছে। এটি নিয়ে আবার কিসের আন্দোলন। আর সরকারই বা পদত্যাগ করবে কেন? তারা কি আন্দোলন করবে তা সবার জানা। তবে আন্দোলনের নামে বিএনপি যদি কোনো সহিংসতা করে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে। আমাদের নেতাকর্মীরা রাজপথে আছে, থাকবে। তাদের যে অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা হবে। তাদের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বিএনপির কত দফায় কত দাবি। এটা রহস্যে ঘেরা। তাদের নিজেদের ওপর নিজেদের বিশ্বাস নেই। তবে তাদের এক দফা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগ মাথা ঘামায় না। আসলে তাদের কোনো আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত যায়নি। এবারও যাবে বলে বিশ্বাস হয় না।

কারণ তাদের সঙ্গে জনগণ নেই। ফলে তাদের সব আন্দোলন বিফলে যাবে। আমরা জনগণকে নিয়ে রাজপথে ছিলাম, আছি। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা জনগণের কাছে যাবো। এরমধ্য দিয়েই আমাদের কর্মসূচি চলবে। তবে এই অশুভ শক্তি দেশে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি পায়তারা করে বা সহিংসতা করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

তাছাড়া আমাদের নেতাকর্মীরাও রাজপথে থেকে তাদের যে কোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জবাব দেবে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, বিএনপির কিসের এক দফা। তারা কি শেখ হাসিনার পদত্যাগ চায়? শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে মাঠে নামলে জনগণই তাদের ঘরে উঠিয়ে দেবে। আমাদের কিছু করা লাগবে না। তারা যদি এক দফার নামে কোনো সন্ত্রাস করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোকাবিলা করবে। আর আমাদের নেতাকর্মীরা তো মাঠে থাকবেই।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *