ভারত-মায়ানমার সীমান্তে ৩১হাজার কোটি টাকার বেড়া, কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখলেন মণিপুরের রাজ্যপাল

2 - মিনিট |

১,৬৪৩ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেড়া দেওয়ার প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় বিরোধ বড় বাধা। মোরে সেক্টরে এখনও পর্যন্ত ৯.২১৪ কিলোমিটার বেড়া ও টহলদারি রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ।

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

ইম্ফল:ভারত-মায়ানমার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার ৩১ হাজার কোটি টাকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলেন মণিপুরের রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লা। বৃহস্পতিবার লোকভবনে আয়োজিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈঠকে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার উপর জোর দেওয়া হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আলোচনায় উঠে আসে।

এর আগে ২১ অক্টোবর মণিপুরের পুলিশপ্রধান মুকেশ সিং-সহ পুলিশের শীর্ষ আধিকারিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মকর্তারা কামজং জেলা পরিদর্শন করেন। এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হয়।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সীমান্ত সড়ক টাস্ক ফোর্সের (বিআরটিএফ) কমান্ডিং অফিসার কর্নেল দেব প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরেন। সীমান্তে বেড়া নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে সীমান্ত সড়ক সংস্থা (বিআরও)। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব, নিরাপত্তা উপদেষ্টা, পুলিশপ্রধান, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র কমিশনার এবং অসম রাইফেলস ও বিআরটিএফের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা।

উখরুলের জেলাশাসক এবং চূড়াচাঁদপুর, চান্দেল ও তেংনৌপালের অতিরিক্ত জেলাশাসকেরাও নিজেদের জেলার পরিস্থিতি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য দেন।

চার রাজ্যে ১,৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্ত

ভারত-মায়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ১,৬৪৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে ৫২০ কিলোমিটার, মিজোরামে ৫১০ কিলোমিটার, মণিপুরে ৩৯৮ কিলোমিটার এবং নাগাল্যান্ডে ২১৫ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ১,৪৭২ কিলোমিটার সীমান্তের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি প্রায় ১৭১ কিলোমিটার অংশে আইনি জটিলতা বা ভৌগোলিক সমস্যার কারণে কাজ আটকে রয়েছে। মণিপুরের চান্দেল জেলার কয়েকটি অংশেও সীমানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

মোরে সেক্টরে এখনও পর্যন্ত ৯.২১৪ কিলোমিটার বেড়া এবং তার সমান্তরালে টহলদারি রাস্তা নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ২০.৮৬২ কিলোমিটার অংশে অনুমোদিত কাজ চালাচ্ছে বিআরও।

ভার্চুয়াল বেড়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ

প্রচলিত বেড়ার পাশাপাশি সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। অসম রাইফেলস মণিপুর ও অরুণাচল প্রদেশে হাইব্রিড সার্ভেল্যান্স সিস্টেমের (এইচএসএস) দুটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পের আওতায় এক কিলোমিটার এলাকায় ভার্চুয়াল বেড়া বা বৈদ্যুতিন নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।

এই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে ৮৩ কিলোমিটার সীমান্তে বৈদ্যুতিন নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে, সীমান্ত এলাকায় অবাধ যাতায়াতের পুরনো ব্যবস্থা—ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম (এফএমআর)—বদলে ১০ কিলোমিটার সীমান্ত অঞ্চলে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর দিকে এগোচ্ছে কেন্দ্র। এই পরিবর্তন সীমান্ত পারাপার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

জমি, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় বিরোধ বড় বাধা

প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, নাগা ও মিজো সংগঠনগুলির বিরোধিতা এবং সীমান্তে মাঝেমধ্যে জঙ্গি হামলা—সব মিলিয়ে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

কামজং সফরের সময় পুলিশপ্রধান ও যৌথ নিরাপত্তা বাহিনীর আধিকারিকেরা ১১ নম্বর অসম রাইফেলস এবং বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকও করেন। পাশাপাশি কুকি ও নাগা নাগরিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এলাকায় শান্তি ফেরাতে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।

৩১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের লক্ষ্য সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করা। তবে নির্মাণকাজের অগ্রগতির পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আপত্তি, জমি ও সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা এবং সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির সমাধানই প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *