বিপ্লবচর্চাই তাঁর দিবারাত্রির কাব্য: শিবশঙ্কর ঘোষ

2 - মিনিট |

স্বাধীনতা তাঁর কাছে যেন প্রাণের আরাম, আত্মার আনন্দ, মনের শান্তি

কে আর সি টাইমস ডেস্ক

স্বাধীনতা দিবস এগিয়ে আসছে। এই দিনগুলো যাঁরা স্মরণ করেন, শুরু হয়েছে তাঁদের ব্যস্ততা। কিন্তু বছরভর নিষ্ঠার সঙ্গে এই স্বাধীনতার নির্যাসকে সযত্নে লালন করেন দক্ষিণ কলকাতার শিবশঙ্কর ঘোষ। স্বাধীনতা তাঁর কাছে যেন প্রাণের আরাম, আত্মার আনন্দ, মনের শান্তি।  

একটাও বই লেখেননি স্বাধীনতার ওপর। নিজে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নেননি। কিন্তু স্বাধীনতার এ টু জেড ঠোঁটস্থ। এক কথায়, স্বাধীনতার রেডি রেকনার। শয়নে-স্বপনে স্বাধীনতা। এই বিষয়ের যাবতীয় বই ও খবরের কাগজের কাটিং যত্ন করে রেখেছেন বছরের পর বছর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৬৩-র ব্যাচের কৃতী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার শিবশঙ্করবাবুর জন্ম ১৯৪২-এ। দেশে তখন আছড়ে পড়েছে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঢেউ। তাঁর বেড়ে ওঠার সময়ে বাবা কালীচরণ ঘোষ এবং মা মলিনাবালা‘ই বুঝি নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লব ও বিপ্লবী চর্চার। পরে চাকরি করতেন রাঁচিতে, কেন্দ্রীয় সরকারের হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনে। কিন্তু ওই নেশা ধাওয়া করে গিয়েছে জীবনভোর। 

স্বাধীনতা-বিষয়ক বা বিপ্লবের যে কোনও যে কোনও ঘটনা জানতে চাইলে উত্তর দিয়ে দেবেন মুহূর্তের মধ্যে। ৭৭ বছর বয়সেও যেন মস্তিষ্কের ক্ষিপ্রতা ২৭-এর মত। আলোচনা শুরু করলে থামতে চান না। কারণ, এই বিষয়টাই তো তাঁর নেশা। ইন্ডো সোভিয়েত কালচারাল সোসাইটি (ইসকাস) থেকে রুশ ভাষা শিখেছিলেন। সেটির শংসাপত্র যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। লোক দেখাতে নয়। ওতে রয়েছে এক টুকড়ো স্বাধীনতার পরশ— কল্পনা দত্তর (যোশী) সই। সংসাপত্র পাওয়ার সময় কল্পনা ছিলেন ইসকাস-এর কর্ত্রী। 

এ রকম নেশা ধরল কীভাবে? শিবশঙ্করবাবু এই প্রতিবেদককে বললেন, “বাবা ছিলেন আদ্যন্ত স্বাধীনতাপ্রেমী। উনি নেতাজীর মেজদা শরৎচন্দ্র বসুর অতি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ১৯৩১-এর ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ের ওপর থেকে সশস্ত্র অভিযানে অভিযুক্তরা শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই একে একে ধরা পড়ে। শরৎ বসু তখন অত্যন্ত নামী আইনজীবী। তাঁকে বাবা সওয়াল করার অনুরোধ করলে তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। বাবা পাল্টা বলেন, “ছেলেগুলো তাহলে মরবে? তা কিছুতেই হবে না।“

শরৎবাবু আমাদের ৬, পন্ডিতিয়া রোডের বাড়িতে আসতেন। মা‘কে বৌদি বলতেন। বাবা জোর করে ওঁকে রাজি করিয়েছিলেন আদালতে ওদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সওয়াল করতে। শরৎ বসু একটি শর্ত দিয়েছিলেন— এজলাসে তাঁর সঙ্গী হতে হবে বাবাকে। বাবা কথা দিয়ে রেখেছিলেন। এক জন অভিযুক্তকেও সে যাত্রায় ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে পারেনি ব্রিটিশরা। আবার, শরৎবাবুর অনুরোধে দুটি বাচ্চা বিপ্লবীকে ভাই পরিচয় দিয়ে মা সোনারপুরের গোপন ঘাঁটি থেকে এনে দু’মাস লুকিয়ে রেখেছিলেন আমাদের কলকাতার বাড়িতে। এ রকম অজস্র ঘটনা দেখতে দেখতে বেড়ে উঠেছি। 

“বিপ্লবীদের অনেকের আনাগোনা ছিল আমাদের বাড়িতে।“ শিবশঙ্করবাবুর কথায়, “ওঁদের কথা গোগ্রাসে গিলতাম। বাবা-মায়ের কাছে শুনতাম আমার না দেখা বিপ্লবীদের অসম সাহসের নানা কথা। বীনা দাস, ত্রিগুণা সেন, হরিকুমার চক্রবর্তী— এঁরা খুব ভালবাসতেন আমাকে। সব মিলিয়ে আমার অস্থিমজ্জায় যেন মিশে গিয়েছিল বিপ্লবের দূর্নিবার হাতছানি। আমার মনন, আমার আবেগ— সব কিছুই হয়ে গিয়েছিল একমুখী।“ আর সে কারণেই যখনই স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি বাক্যও কোথাও শোনেন বা দেখেন, খাড়া হয়ে ওঠে ভাবনার অ্যান্টেনা। 

স্বাধীনতার ৭২ বছর বাদে সত্যিই কি ফিকে হয়ে গিয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রভাব? শিবশঙ্করবাবুর জবাব, “আমি তা মনে করি না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকে এ ব্যাপারে গবেষণার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়ের একটি সংগঠন আছে। আড়াই বছর আগে রবীন্দ্র সদনে সেটির একটি অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম কুইজ মাস্টার। প্রশ্নোত্তরের বিষয় ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ২২টা অফ বিট প্রশ্ন রেখেছিলাম। ২০টার জবাব কিন্তু পেয়েছি। উত্তরদাতাদের বেশ ক’জন ছিলেন এই প্রজন্মের।  এর পরে কীভাবে বলি স্বাধীনতার পরশ ধূসর হয়ে গিয়েছে?” লেখার রসদ চাইলে ‘না’ নেই। শর্ত একটা— নাম দেওয়া চলবে না। কারণ, প্রচারের আড়ালেই বিপ্লবচর্চার নেশাটাকে তরিয়ে তরিয়ে উপভোগ করতে চান শিবশঙ্করবাবু। আর ছবি? একটা বিগ নো।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *