কর্মসংস্থান, শিল্প ও পর্যটনে জোর: বরাক ভ্যালির সার্বিক উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রস্তাব
কেআরসি টাইমস বারাক ভ্যালি ব্যুরো
শিলচর :বরাক উপত্যকার নাগরিক মঞ্চের পক্ষ থেকে বরাক উপত্যকার সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও কর্মসংস্থানমুখী প্রতিষ্ঠানিক ক্লাস্টার গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। নাগরিক মঞ্চের মতে, কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি নিয়ে গঠিত বরাক উপত্যকা একটি ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যার মধ্যে শ্রীভূমি জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৬৫০–৭০০ জন—যা অসমের সর্বোচ্চগুলির মধ্যে অন্যতম।
এত উচ্চ জনঘনত্ব থাকা সত্ত্বেও চা-বাগান শ্রমিক, মৎস্যজীবী এবং পুনর্বাসিত জনগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে শিল্পের অভাব ও বেকারত্ব দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। পাচগ্রামের কাগজ কল এবং রাতাবাড়ির চিনি কল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরও বেড়েছে এবং বহির্গমন বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, অসমের জাগিরোডে টাটা ইলেকট্রনিক্স-এর সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পকে সামনে রেখে বরাক ভ্যালিতে একটি “সেমিকন্ডাক্টর ও আধুনিক ইলেকট্রনিক্স দক্ষতা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট” স্থাপনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত মানবসম্পদ তৈরি করবে এবং সহায়ক শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
প্রস্তাবিত “বরাক ভ্যালি ফ্রন্টিয়ার স্কিলস, লজিস্টিক্স ও গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং ক্লাস্টার” {Barak Valley Frontier Skills, Logistics & Green Manufacturing Cluster (BV-FSLGMC)}-এর অধীনে আরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—লজিস্টিক্স ও সীমান্ত বাণিজ্য প্রশিক্ষণ একাডেমি, নীল অর্থনীতি ও মৎস্য উন্নয়ন কেন্দ্র, বাঁশ ও পাট বা জুট-আদি ভিত্তিক সবুজ শিল্প প্রতিষ্ঠান (যেমন—ইঞ্জিনিয়ার্ড বাঁশ বোর্ড, ফার্নিচার, প্রিফ্যাব নির্মাণ উপকরণ, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও বাঁশ-পাট হ্যান্ডিক্রাফট উৎপাদন), চা-বাগান যুব দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র, স্বাস্থ্য ও প্যারামেডিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং ই-ওয়েস্ট ও আধুনিক উপকরণ পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র।
নাগরিক মঞ্চ আরও প্রস্তাব করেছে যে, বরাক উপত্যকার বিভিন্ন টিলা (tilla) এলাকায় বন্য বানরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ ও সাধারণ জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইন্দোনেশিয়ার উবুদ বানর বন“ Ubud Monkey Forest” (বালি) এবং জাপানের ইওয়াতায়ামা বানর উদ্যান Iwatayama Monkey Park” (কিয়োটো) ও জিগোকুদানি স্নো বানর উদ্যান “Jigokudani Snow Monkey Park” (নাগানো) -এর আদলে নির্দিষ্ট টিলা এলাকায় পরিকল্পিত “বানর সংরক্ষণ ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র” গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট আবাসভূমি, নিয়ন্ত্রিত খাদ্য সরবরাহ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমানো যাবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
নাগরিক মঞ্চ আরও দাবি জানিয়েছে যে, করিমগঞ্জের সোন বিল (Son Beel)—যা এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলির মধ্যে অন্যতম—তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। এর পাশাপাশি, শিলচরের লাবক এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক লাবক হাসপাতাল প্রাঙ্গণ—যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী স্যার রোনাল্ড রস গবেষণা কার্য পরিচালনা করেছিলেন—তাকে “মেডিক্যাল হেরিটেজ ও ইকো-ট্যুরিজম সাইট” হিসেবে উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে, শ্রীভূমির চাঁদখিরা এলাকায় লঙ্গাই ভ্যালি ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে কেন্দ্র করে “টি রিসোর্ট ও হেরিটেজ ট্যুরিজম কেন্দ্র” গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে, যা চা-বাগান সংস্কৃতি ও পর্যটনকে নতুন মাত্রা দেবে।
নাগরিক মঞ্চের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য আধুনিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, বহির্মুখী শ্রমনির্ভরতা কমবে এবং বরাক ভ্যালি একটি ভবিষ্যৎমুখী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হবে। নাগরিক মঞ্চ সকল রাজনৈতিক দলের নিকট এই প্রস্তাবটি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করে বরাক উপত্যকার উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে।



