বিএসএফের উপর হামলার ঘটনায় কড়া বার্তা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার; ১৯ অভিযুক্তের মধ্যে গ্রেফতার ১০, সীমান্তবর্তী এলাকায় জমি চিহ্নিতকরণে প্রশাসন
কে আর সি টাইমস ডেস্ক
আগরতলা: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জওয়ানদের উপর হামলা, চোরাচালান এবং অন্যান্য বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল ত্রিপুরা সরকার। এ ধরনের ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। একই সঙ্গে সোনামুড়া মহকুমার আশাবাড়ি সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের তিন দিন পর জমি চিহ্নিতকরণ ও মালিকানার নথি যাচাই শুরু করেছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার আগরতলার টিআইএফটি সম্মেলন কক্ষে উচ্চপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের উপর হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশ মহানির্দেশক, স্বরাষ্ট্রসচিব, বিএসএফের ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং সিআরপিএফ ও অসম রাইফেলসের পদস্থ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।
গত ৩ নভেম্বর আশাবাড়িতে বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের ঘটনাটি বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। ঘটনার তদন্ত এবং পুলিশের পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এফআইআরে নাম থাকা ১৯ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের ধরতে তল্লাশি চলছে।
মুখ্যমন্ত্রী ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে যৌথ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিএসএফের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উপরও জোর দেন সাহা।
এদিকে, আশাবাড়ি সীমান্ত চৌকির (বিওপি) সংলগ্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার থেকে জমি চিহ্নিতকরণ ও মালিকানার নথি যাচাই শুরু করেছে সোনামুড়া মহকুমা প্রশাসন। মহকুমা শাসকের নির্দেশে বিএসএফ, পুলিশ এবং রাজস্ব দফতরের আধিকারিকদের নিয়ে একটি যৌথ দল এলাকায় যায়। দলে রাজস্ব পরিদর্শক ও তহশিলদাররাও ছিলেন।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জমির নথিতে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে কিংবা সরকারি জমিতে বসবাস বা ব্যবসা করার প্রমাণ মিললে উচ্ছেদের মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে খবর, বেশ কয়েকটি পরিবার ও দোকানদারকে তাঁদের জমির দলিল এবং অন্যান্য মালিকানা সংক্রান্ত নথি দেখাতে বলা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের যাচাইয়ে কিছু জমির দখলদারদের কাছে বৈধ মালিকানার নথি না থাকার সম্ভাবনা উঠে এসেছে। কয়েকটি পরিবার সরকারি জমিতে বসবাস করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রাথমিক জমি চিহ্নিতকরণের কাজ শেষ হলেও নথি যাচাইয়ের পর প্রশাসন কী পদক্ষেপ করবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। স্থানীয়ভাবে ফৈজল হক, আজাদ মিঞা ও মজুমদারের দোকান এবং কবির হোসেন ও গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি বসতবাড়ির জমির নথিও পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে তাঁদের জমির মালিকানা নিয়ে প্রশাসনের তরফে এখনও কোনও চূড়ান্ত বক্তব্য জানানো হয়নি।
জেলা প্রশাসনের দাবি, সোনামুড়া মহকুমায় গত দু’মাস ধরে সরকারি জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের অভিযান চলছে। এই সময়ে সোনামুড়া মহকুমার ৪২টি এবং বিশালগড় মহকুমার একটি এলাকায় সরকারি জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সীমান্তবর্তী এলাকায় জমি কেনাবেচা ও মালিকানা হস্তান্তরের উপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর শেষ ত্রিপুরা সফরের সময় এই বিষয়ে রাজ্য প্রশাসনকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীরা যাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় জমি কিনে নিজেদের নামে নথিভুক্ত করতে না পারে, সেই আশঙ্কা থেকেই এই নজরদারির উদ্যোগ বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।
তবে আশাবাড়িতে জমি যাচাইয়ের পর কতগুলি জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেবে, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় বাসিন্দাদের।


